Madhyamik History Suggestion 2025 | মাধ্যমিক ইতিহাস সাজেশন
Class 10 2nd summative History suggestion 2024 || Madhyamik 2025 History 2nd unit test suggestion ||
Suggestion by Soumen Bera
Madhyamik History Suggestion 2025 | মাধ্যমিক ইতিহাস সাজেশন
Madhyamik History suggestion 2025 download as per the madhyamik 2025 new Here is History suggestion 2025 pdf free download links. Wbbse 10th History suggestion as per syllabus and question pattern.
Madhyamik History Suggestion 2025:
If you are a Madhyamik student then this article is helpful for you. This suggestion is made by expert teachers, based on previous question analysis. So if you secure good marks in madhyamik 2025 examinations please read and practice very carefully all these History suggestion 2025 questions. It’s Absolutely Free Suggestion Pdf. (100% Free Download)
মাধ্যমিক ইতিহাস সাজেশন 2025:
বহু ছাত্রছাত্রীরা মাধ্যমিক ইতিহাস সাজেশন -এর খোঁজ করে থাকে। তাদের জন্য এখানে মাধ্যমিক ইতিহাস সাজেশন ২০২৫, মাধ্যমিক ইতিহাস সাজেশন 2025 pdf,মাধ্যমিক ইতিহাস সাজেশন ২০২৫ mcq,মাধ্যমিক ইতিহাস সাজেশন ২০২৫ রচনা দেওয়া হল। এগুলি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে আমাদের
http://no1target.blogspot.com ওয়েবসাইটে।
1. নারী ইতিহাসের উপর একটি টীকা লেখো।
উওর: সাবেক ইতিহাসে উপেক্ষিত নারী সমাজের ভূমিকার পুনর্মূল্যায়ন আধুনিক ইতিহাসচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
লাৱী ইতিহাসচর্চা
গবেষণা: পাশ্চাত্যে নারীবাদী ইতিহাসচর্চার ধারা অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সূচিত হলেও ভারতের মতন দেশে এই চর্চা অপেক্ষাকৃত নবীন। ভারতে নারীবাদী ইতিহাস নিয়ে উল্লেখযােগ্য কাজ করেছেন নীরা দেশাই, বি. আর. নন্দা, মালবিকা কালেকর প্রমুখ।
পুরুষকেন্দ্রিক ইতিহাসের সংশােধন: প্রচলিত ইতিহাসে নারীর ভূমিকা সর্বদাই প্রান্তিক। সেই প্রান্তিকতা থেকে সরে এসে ইতিহাসে নারীর ভূমিকার প্রকৃত মূল্যায়ন নারীবাদী ইতিহাসচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বস্তুতপক্ষে নারীবাদী ইতিহাস হলাে একধরনের সংশােধনবাদী ইতিহাসচর্চা।
নারীর অধিকার: সমতা প্রতিষ্ঠা ও নারীর অধিকার এবং নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা নারীবাদী ইতিহাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
নারীর অংশগ্রহণ: বিভিন্ন সময়কালেসমাজেনারীর পরিবর্তিত অবস্থান,আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে নারীর ভূমিকা, নারীর পােশাক, কর্মসংস্থান, ধর্ম-কর্ম-গার্হস্থ্য ও শিল্পোৎপাদন কর্মে নারীর অংশগ্রহণ প্রভৃতিকে চিহ্নিত করা নারীবাদী ইতিহাসচর্চার মূল প্রতিপাদ্য।
সভ্যতার অগ্রগতির মাপকাঠি: যে নারী ‘অর্ধেক আকাশ’তথা শক্তির স্বরূপ, সেই নারীকে বাদ দিয়ে কোনাে সমাজ কোনাে কালে অগ্রসর হতে পারে না। বস্তুতপক্ষে কোনাে সমাজ বা সভ্যতায় নারীর অবস্থান ও মর্যাদার উপর সেই সমাজের অগ্রসরতা বা পশ্চাগামীতা নির্ভর করে। তাই নারী ইতিহাস হয়ে উঠেছে সভ্যতার অগ্রগতির মাপকাঠি।
মন্তব্য: ভারতবর্ষেনারীবাদী ইতিহাসচর্চার ধারা অপেক্ষাকৃত নবীন হলেও বর্তমানে এর ক্ষেত্র অনেকটাই বিস্তৃত। আধুনিক ভারতীয় সমাজে নারীর সর্বব্যাপী অধিকার ভারতীয় সমাজের অগ্রগতির যথার্থ মাপকাঠি।
উত্তর: আধুনিক ভারত ইতিহাসের আকর উপাদান হিসাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী জীবনস্মৃতি’ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
জীবনস্মৃতি
প্রকাশ: লেখকের আত্মকথন প্রথমে প্রবাসী’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং পরে ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। পরিসর ও আত্মজীবনীতে ১৮৬১-৮৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত লেখকের আত্মকথা ও দেশকথা বর্ণিত হয়েছে।
জ্ঞাতব্য বিষয়
ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল: আত্মজীবনীতে রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের স্মৃতির সূত্র ধরে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, রুচি, খাদ্যাভ্যাস, পারিবারিক সম্পর্ক ও বিধি-নিষেধ, নারী স্বাধীনতা, শিশুদের জীবনধারা, বালক রবীন্দ্রনাথের কাব্য-সংগীত চর্চা এবং বয়ঃপ্রাপ্তির কথা সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এগুলি আধুনিক বাংলার সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
স্বাদেশিকতা: আত্মজীবনীর স্বল্প পরিসরে স্বাদেশিকতা নিয়ে অত্যন্ত সরস ভাষায় তিনি যে অনবদ্য আলােচনা করেছেন, ইতিহাসের যেকোনাে ছাত্রকে তা মুগ্ধ করে। সেই যুগে অভিজাত বাঙালি পরিবারে বিভিন্ন বিদেশি প্রথার প্রচলন শুরু হলেও স্বদেশের প্রতি অনুরাগও জাগ্রত ছিল। স্বয়ং তাঁর পরিভাষায়—“বাহির হইতে দেখিলে আমাদের পরিবারে অনেক বিদেশি প্রথার প্রচলন ছিল। কিন্তু আমাদের পরিবারের হৃদয়ের মধ্যে একটা স্বদেশাভিমান স্থিরদীপ্তিতে জাগিতেছিল।”
রাজনৈতিক ঘটনাবলী: জীবনস্মৃতি’তে-তে কবি রাজনারায়ণ বসুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্বাদেশিকতার গােপনসভা এবং তাতে ঠাকুরবাড়ির বালকদের যােগদান, দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে ধুতি ও পাজামার সমন্বয়ে একটি সর্বভারতীয় পরিচ্ছদ প্রচলনের চেষ্টা, স্বদেশি দেশলাই কারখানা বা কাপড়ের কল প্রতিষ্ঠায় যুবকদের উদ্যোগ প্রভৃতির উল্লেখ করেছেন।
হিন্দু মেলার প্রসঙ্গ: আত্মকথনে কবি নবগােপাল মিত্রের নেতৃত্বে হিন্দুমেলার প্রতিষ্ঠা ও তার কার্যকলাপের এক বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন। উল্লেখ্য, এই হিন্দমেলাই তৎকালীন ভারতবর্ষে স্বদেশভাবনার অন্যতম কেন্দ্ররূপে গড়ে উঠেছিল।
মন্তব্য: অসম্পূর্ণতা ও স্বল্প পরিসর দোষে দুষ্ট হলেও রবি ঠাকুরের আত্মজীবনী শুধু তাঁর জীবনদর্পণ নয়, তা একাধারে সমকালীন সমাজ ও রাষ্ট্রনৈতিক জীবনের চলমান প্রতিচ্ছবি। সহজ-সাবলীল ভাষায় রচিত তার এই আত্মকথন আধুনিক ইতিহাসকে করেছে সমৃদ্ধ ও চিত্তাকর্ষক।
3. নতুন সামাজিক ইতিহাসের উপর একটি টিকা লেখাে।
অথবা, আধুনিক ইতিহাসচর্চার বৈচিত্র্যের দিকটি সংক্ষেপে আলােচনা
উত্তর: রাজা-রাজড়ার বৃত্তান্তে এতদিন থেমেছিল ইতিহাস, রাজবাড়ির কথায় ফুরিয়েছিল তার দৌড়। কিন্তু আজ ইতিহাসের রাজত্ব দিগন্ত প্রসারিত। সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে, সমাজ জীবনের স্তরে স্তরে, জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-সংস্কৃতির নানান ধারায় ইতিহাস আজ নিজেকে যুক্ত করেছে। আধুনিক ইতিহাসচর্চা যেমন সমগ্রতার সন্ধানী, তেমনি বৈচিত্র্যেরও।
বিষয়বস্তু: সাবেক ইতিহাসে প্রধানত সমাজের একটি বিশেষ অংশের জীবনযাপন, তাদের কাজকর্ম, চিন্তা-ভাবনা এবং উত্থান-পতনের উপর আলােকপাত করা হয়। কিন্তু নতুন সামাজিক ইতিহাসচর্চা সামগ্রিকভাবে সমাজের কথা বলতে চায়। সমাজে অস্তিত্ব আছে কিন্তু সাবেক ইতিহাসে স্থান পায়নি এমন সবকিছুই আধুনিক ইতিহাসের বিষয়। সেই সঙ্গে খেলাধুলা, পােশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস, শিল্পচর্চা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ, চিকিৎসাবিদ্যার অগ্রগতি, সামরিক বিবর্তন ও নারী সমাজের কথাও আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৈচিত্র্যের দিক। এককথায়, নতুন আধুনিক ইতিহাসচর্চা সমাজবদ্ধ মানুষের
সামগ্রিক জীবনব্যাখ্যা।
অ্যানালস গােষ্ঠী: ১৯২৯ সালে ফ্রান্সে মার্ক ব্লখ ও লুসিয়ান ফেবরের উদ্যোগে অ্যানাল অফ ইকোনমিক অ্যান্ড সােশ্যাল হিস্ট্রি’ নামক পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে এই গােষ্ঠী গড়ে ওঠে। এই গােষ্ঠীর ইতিহাসচর্চায় রাজনৈতিক প্রসঙ্গ ব্যতিরেকে সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাধারণ মানুষ, পরিবার, মনস্তত্ব প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয় স্থান লাভ করে।
নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চা: জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-শ্রেণি নির্বিশেষে সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্গের মানুষদের নিয়ে যে ইতিহাসচর্চা বর্তমানে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, তা নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চা নামে পরিচিত। এই ধরনের ইতিহাসচর্চায় তথাকথিত নিম্নবর্গের নাম না জানা মানুষরাই ইতিহাসের যথার্থ নায়কে পরিণত হয়েছে। এই ধারার সাথে যুক্ত কয়েকজন বিখ্যাত ঐতিহাসিক হলেন রণজিৎ গুহ, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, গৌতম ভদ্র প্রমুখ।
মন্তব্য: নতুন সামাজিক ইতিহাসচর্চা সমগ্রতার সন্ধানী। সমাজবদ্ধ কিন্তু স্বীকৃতিহীন মানুষদের ইতিহাসের পাদপ্রদীপে তুলে এনে এই ইতিহাসচর্চা যথার্থ অর্থেই ইতিহাসে নব দিগন্তের উন্মােচন ঘটিয়েছে।
দ্বিতীয় অধ্যায়
(প্রশ্নমান ৪)
1. স্বামী বিবেকানন্দের ধর্ম সংস্কারের আদর্শ ব্যাখ্যা করো। ****
উত্তর: আধুনিক ভারতের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন শ্রীরামকৃয় দেবের প্রিয়তম শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ।
স্বামী বিবেকানান্দব ধর্ম সংস্কার
নব্য বেদান্তের প্রচারক : স্বামীজির ধর্মীয় চিন্তাধারার গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নব্য বেদান্তবাদ। বিবেকানন্দ প্রাচীন অদ্বৈত দর্শনের নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়ে এটিকে জনপ্রিয় করে তােলেন। কুসংস্কার, অস্পৃশ্যতা, জাতিভেদ, ধনী-দরিদ্রের প্রভেদ দূর করে তিনি
জাতিকে ঐক্য ও কর্মশক্তিতে উদ্দীপ্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর নব্য বেদান্তের অভিমুখ ছিল—জগতের কল্যাণেই নিজের মােক্ষলাভ।
জীবসেবার আদর্শঃ তার ধর্মদর্শনে ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’র আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে। বিশ্ববাসীর প্রতি তার দীক্ষা—“জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।”
বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের আদর্শ প্রচারক : ১৮৯৩ সালের শিকাগাে ধর্ম সম্মেলনে ভারতের আধ্যাত্মিকতার সনাতন স্বরূপ তিনি বিশ্ববাসীর সম্মুখে তুলে ধরেন। বেদান্তের নতুন ব্যাখ্যা এবং তার সহায়ক উপাদানরূপে কর্মযােগের প্রচার করে বিশ্ববাসীকে অমৃতলােকের সন্ধান তিনি দিয়েছেন। তাঁর মতে, যুদ্ধ ও ধ্বংসের পরিবর্তে শান্তি ও সৌভ্রাতৃত্বই সমৃদ্ধির একমাত্র পথ।
মানুষ গড়ার ধর্ম : স্বামীজির কাছে ধর্ম’ কেবলমাত্র আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানাদির সমষ্টিমাত্র নয়, ‘ধর্ম’ তার কাছে মানুষ গড়ার হাতিয়ার। যে ধর্ম মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে, সেই ধর্মকে তিনি গ্রহণ করেননি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ভেদহীন সনাতন মানবধর্মের জয়গান তিনি গেয়েছেন।
মন্তব্য : বিবেকানন্দের “Man making religion’ এবং নব্য বেদান্তবাদ’-এর আদর্শ মানুষের মনের জমিকে করেছে উর্বর। তার ভাবাদর্শে বিশ্ববাসী হয়েছে স্নাত। পরাধীন দেশবাসীকে তিনি দিয়েছেন নতুন করে বাঁচার প্রেরণা। ঋষি অরবিন্দের পরি- ভাষায়—“বিবেকানন্দই আমাদের জাতীয় জীবনের গঠনকর্তা।"
2. এদেশের চিকিৎসা – বিদ্যার ক্ষেত্রে কলকাতা মেডিকেল কলেজের কী ভূমিকা ছিল?***
উত্তর : ভারতের সনাতনী চিকিৎসাবিদ্যার বিপ্রতীপে আধুনিক ও পাশ্চাত্য অভিমুখী চিকিৎসাবিদ্যার অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার জন্যও ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছিলেন স্বয়ং বেন্টিঙ্ক সাহেব এবং ভূমিদান করেন মতিলাল শীল।
কলকাতা মেডিকেল কলেজ হলাে এশিয়ার দ্বিতীয় কলেজ যেখানে আধুনিক ইউরােপীয় চিকিৎসাবিদ্যা শেখানাে হতাে। কলকাতা মেডিকেল কলেজে আধুনিক শল্য চিকিৎসার ব্যবস্থাপনা ও রূপায়ণে উদ্যোগী হন এর প্রথম সুপারিনটেনডেন্ট এম. জে. ব্রামলি।
কলকাতা মেডিকেল কলেজে শব ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে আধুনিক বিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্রের সূচনা করেছিলেন মধুসূদন গুপ্ত ও তার সহযােগীরা। কলকাতা মেডিকেল কলেজের দ্বার সকল বর্ণের ছাত্রদের জন্য এমনকি মেয়েদের জন্যও উন্মুক্ত ছিল। কাদম্বিনী গাঙ্গুলি ছিলেন প্রথম মহিলা চিকিৎসক এবং পরবর্তীকালে ভার্জিনিয়া মেরী মিত্র ও বিধুমুখী বসু এখান থেকেই যােগ্যতার সঙ্গে চিকিৎসাবিদ্যায় উত্তীর্ণ হন। কলকাতা মেডিকেল কলেজ বাংলা তথা ভারতের চিকিৎসাবিদ্যার অগ্রগতির ক্ষেত্রে এক নবযুগের সূচনা করে।
3. গাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা উল্লেখ করো।****
উত্তর : আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত সাহিত্যে প্রভূত পাণ্ডিত্য থাকা সত্ত্বেও রাজা রামমােহন পাশ্চাত্য শিক্ষার একজন উৎসাহী সমর্থক ছিলেন। তিনি মনে করতেন যে, আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার উপর ভিত্তি করেই নব ভারত গড়ে উঠবে।
পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা
পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন : পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে রাজা রামমােহন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ ভূমিকা নেন। হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠা (১৮১৭) ও পরিচালনার সঙ্গে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন বলে অনেকে মনে করেন। তিনি নিজ ব্যয়ে অ্যাংলাে হিন্দু স্কুল (১৮১৫) ও বেদান্ত কলেজ (১৮২৫) প্রতিষ্ঠা করেন। ডেভিড হেয়ারের শিক্ষা প্রসারের কাজে তিনিই ছিলেন মুখ্য সহায়ক। স্কটিশ মিশনারী আলেকজান্ডার ডাফ কলকাতায় জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠায় (১৮৩০) ব্রতী হলে রাজা রামমােহন তাঁর প্রধান পৃষ্ঠপােষকে পরিণত হন।
আমহার্স্ট-কে পত্র প্রেরণ : ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের সনদ আইনে বরাদ্দকৃত সরকারি ১ লক্ষ টাকা প্রাচ্য শিক্ষা খাতে ব্যয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলে পাশ্চাত্যপন্থী রাজা রামমােহন এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে বড়লাট লর্ড আমহার্স্টকে পত্র প্রেরণ করেন। ঐতিহাসিক এই পত্রে তিনি সংস্কৃত শিক্ষার অসারতা প্রমাণ করে ভারতে আধুনিক ও যুগপােযােগী পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের জোরালাে দাবি জানান। ভারতীয় নবজাগরণের ইতিহাসে এক মূল্যবান দলিল রাজা রামমােহন রায়ের এই ঐতিহাসিক পত্রটি।
মন্তব্য : প্রাচ্যের শাশ্বত চিন্তাধারার সঙ্গে পাশ্চাত্যের আধুনিক শিক্ষা ও যুক্তিবাদের সমন্বয় ঘটিয়ে রাজা রামমােহন এক নবভারত গঠনের স্বপ্ন দেখেন। যথার্থই তিনি ছিলেন ভারতীয় নবজাগরণের অগ্রদূত।
4. নারীশিক্ষা প্রসারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান সংক্ষেপে আলােচনা করাে।
উত্তর : বঙ্গীয় নবজাগরণের মূর্ত প্রতীক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নারীশিক্ষার একজন উৎসাহী সমর্থক ছিলেন। তিনি স্পষ্টতই উপলব্ধি করেন যে, একমাত্র শিক্ষাই পারে যুগ-যুগান্তর- সঞ্জিত কুসংস্কারের মূলে আঘাত হেনে নারী সমাজকে আধুনিকতার আলােকে উদ্ভাসিত করতে।
নারীশিক্ষা প্রসারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান
প্রাথমিক উদ্যোগ : স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ। উদ্যোগ ছিল ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে বেথুন সাহেবের সহযােগিতায় ‘হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় (বর্তমান বেথুন স্কুল) প্রতিষ্ঠা। এছাড়াও তাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল’। নারীশিক্ষার প্রয়ােজনীয়তা সম্পর্কে জনমত গঠনের জন্য তিনি সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় নিয়মিত লেখনী ধারণ করেন।
বিদ্যালয় পরিদর্শরূপে ভূমিকা : সরকারের অধীনে বিশেষ বিদ্যালয় পরিদর্শক থাকাকালীন (১৮৫৭-৫৮ খ্রিঃ) তিনি বর্ধমান, নদিয়া, হুগলি ও মেদিনীপুর জেলায়। মােট ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ১৩ হাজার ছাত্রী এইসব বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের সুযােগ পায়। নিজ জন্মস্থান বীরসিংহ গ্রামে মাতা ভগবতী দেবীর স্মৃতি রক্ষার্থে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ভগবতী বিদ্যালয়।
ব্যক্তিগত উদ্যোগ : বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত স্কুলগুলি সরকারি অনুমােদন লাভে ব্যর্থ হলে তিনি শেষ পর্যন্ত সরকারি পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং বিদ্যালয়গুলির যাবতীয় ব্যয়ভার নিজে বহন করেন। এই উদ্দেশ্যে নারীশিক্ষা ভাণ্ডার’ নামে একটি তহবিল গড়ে তােলেন। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে চন্দ্রমুখী বসু মেয়েদের মধ্যে প্রথম এম. এ. পাশ করলে তিনি তাকে একখণ্ড শেক্সপিয়ারের রচনাবলী উপহার দেন।
মন্তব্য : স্বামী বিবেকানন্দ একদা বলেছিলেন—“রামকৃয়দেবের পর আমি বিদ্যাসাগরকে অনুসরণ করি।” বাস্তবিকই বিদ্যাসাগর দেশবাসীর কাছে অনুসরণযােগ্য ব্যক্তিত্ব।
5. “গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’য় উনিশ শতকের বাংলার গ্রামীণ সমাজের কীরূপ ছবি ফুটে উঠেছে?
উত্তর : বঙ্গীয় জাতীয় জাগরণ ও গ্রামীণ সাংবাদিকতার ইতিহাসে ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ এক উল্লেখযােগ্য নাম।
প্রকাশ : ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি গ্রাম থেকে প্রকাশিত হয় মাসিক পত্রিকা গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’।
নামকরণ : গ্রাম ও গ্রামবাসীদের অবস্থা তুলে ধরার জন্যই এই পত্রিকার এইরূপ নামকরণ।
সম্পাদনা : এর সম্পাদনার দায়িত্ব নেন কুমারখালির পাঠশালার পণ্ডিত হরিনাথ মজুমদার, যিনি ‘কাঙাল হরিনাথ’ নামেই সমধিক পরিচিত।
গ্রামীণ সাংবাদিকতা : গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ যথার্থ অর্থেই সমকালীন বাংলার গ্রাম সমাজের দর্পণ। জাতীয় জাগরণের ওই দিনগুলিতে হরিনাথ বেছে নিয়েছিলেন শহর কলকাতা নয়, দরিদ্র ও সমস্যা-জর্জরিত গ্রাম-বাংলাকে। পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যা জুড়েই জমি, জমিদার, কৃষক, মহাজন, নীলকর এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ের আলােচনা থাকতাে। জমিদারি নিপীড়ন, পুলিশের অসাধুতা, বিচারের নামে অবিচার, সাধারণ মানুষের অসহায়তার খবর দিনের পর দিন তিনি ছেপেছেন অসীম সাহসে। সামাজিক অত্যাচার ও নিত্য-নিপীড়ন থেকে প্রজাদের মুক্তির জন্য হরিনাথ নিজে সংগ্রামীর ভূমিকা নিয়েছেন। ফলত জমিদারের প্রলােভন ও আক্রমণের লক্ষ্য হয়েছেন বারংবার। সর্বস্ব খুইয়েও প্রজাস্বার্থের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।
মন্তব্য : নিরপেক্ষতা ও স্বৈরাচার বিরােধিতার এক মূর্ত প্রতীক গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’। প্রলােভন ও ভীতির উর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের যে দৃষ্টান্ত গ্রামবার্তা স্থাপন করেছিল, বর্তমানে তা বড়ই দুর্লভ।
(প্রশ্নমান ৮)
1. শিক্ষা বিস্তারে প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক কী? উচ্চশিক্ষার বিকাশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা আলােচনা করাে।
প্রথম অংশ
উত্তর : ঔপনিবেশিক ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের ইতিহাস পর্যালােচনায় যে বিতর্কটি প্রাসঙ্গিক ভাবেই উঠে আসে, তা হলাে—প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক।
প্রাচ্যবাদী এ পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক
বিতর্কের সূচনা : ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের সনদ আইনের ২৯ নং ধারায় বলা হয় যে, ভারতীয়দের শিক্ষার জন্য কোম্পানি এখন থেকে বছরে অন্তত ১ লক্ষ টাকা ব্যয় করবে। কিন্তু সনদ আইনে উল্লেখিত এই এক লক্ষ টাকা প্রাচ্য না পাশ্চাত্য—কোন শিক্ষাখাতে ব্যয়িত হবে, তার স্পষ্ট নির্দেশিকা না থাকায় অচিরেই নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ইতিহাসে এই বিতর্ক প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক নামে পরিচিত।
প্রাচ্যবাদীগণ : প্রাচ্যবাদীদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য ছিলেন উইলিয়াম কোলব্রুক, উইলসন, প্রিন্সেপ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।
মূল বক্তব্য : এঁদের বক্তব্যের মূল নির্যাস হলাে, ভারতে ইংরাজি ভাষা ও ইংরাজি শিক্ষার প্রবর্তন করলে তা আপামর ভারতবাসীর হৃদয়ে ক্ষোভের সঞ্চার করবে এবং তা ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেবে।
পাশ্চাত্যবাদীগণ : পাশ্চাত্যবাদীদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য ছিলেন আলেকজান্ডার ডাফ, মেকলে, স্যান্ডার্স, রামমােহন রায় প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।
মূল বক্তব্য : এঁদের বক্তব্যের মূল নির্যাস হলাে, একমাত্র পাশ্চাত্য তথা ইংরাজি শিক্ষা বিস্তৃত হলেই ভারতীয়দের পচনশীল সমাজব্যবস্থা এবং ধর্ম ও চরিত্রের অধঃপতিত নৈতিকতার উন্নতি ঘটবে।
‘মেকলে মিনিটস্’ : লর্ড বেন্টিঙ্কের আইন সচিব ও খ্যাতনামা পণ্ডিত টমাস ব্যাবিংটন মেকলে কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন’-এর সভাপতি নিযুক্ত হয়ে ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে তার বিখ্যাত ‘মিনিটস্’ বা প্রতিবেদনে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের উপর গুরুত্ব আরােপ করেন এবং বলেন যে, উচ্চ ও মধ্যবিত্তের মধ্যে ইংরাজি শিক্ষা বিস্তৃত হলে Filtration theory’ অনুযায়ী তা ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। এটি ‘মেকলে মিনিট’ নামে পরিচিত।
বিতর্কের অবসান : মেকলের অসাধারণ বাগ্মিতা ও যুক্তির কাছে প্রাচ্যবাদীরা পরাজিত হন। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে বড়লাট বেন্টিঙ্ক ইংরাজি শিক্ষাকে সরকারি নীতি হিসেবে ঘােষণা করলে দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলতে থাকা প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্কের অবসান ঘটে।
প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্কে পাশ্চাত্যবাদীদের জয়লাভের ফলে ভারতে ইংরাজি মাধ্যমে পাশ্চাত্যশিক্ষার দরজা খুলে যায়। ভারতীয়দের বিশুদ্ধ জ্ঞান-পিপাসা বঙ্গীয় নবজাগরণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।
দ্বিতীয় অংশ
উচ্চশিক্ষার বিকাশকলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ৰ ভূমিকা
ভারতে পাশ্চাত্য ধাঁচে আধুনিক উচ্চতর শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে স্যার চার্লস উডের নির্দেশনামার ভিত্তিতে বড়লাট লর্ড ক্যানিং-এর শাসনকালে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে শুরু করে আজও এই প্রতিষ্ঠান উচ্চশিক্ষার প্রসারে তার সদর্থক ভূমিকা পালন করে চলেছে।
উদ্দেশ্য : সূচনালগ্নেকলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ছিল অধীনস্থও অনুমােদিত স্কুল-কলেজগুলির পরীক্ষা গ্রহণ এবং ডিগ্রি প্রদান। যদিও পরবর্তীতে এই বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষণ-ধর্মী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
পরিসর : সূচনালয়ে সমগ্র উত্তর, পূর্ব ও মধ্যভারত, এমনকি বর্তমান মায়ানমার এবং শ্রীলঙ্কার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কলেজগুলির শিক্ষা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হতাে।
পরীক্ষা গ্রহণ : বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনায় প্রথম বি.এ. পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ১৮৫৮ সালে। মােট ১১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও যদুনাথ বসু স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এর ২৬ বছর পর ১৮৮৩ সালে মহিলাদের মধ্যে প্রথম কাদম্বিনী গাঙ্গুলি ও চন্দ্রমুখী বসু স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। এইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্ৰমে গণশিক্ষার দ্বার খুলে দিতে থাকে।
স্যার আশুতােষ মুখােপাধ্যায়ের তাৰদান : ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে স্যার আশুতােষ মুখােপাধ্যায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে যােগদান করেন। তার কার্যকাল যথার্থই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ। এই সময় দ্বারভাঙা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার স্থাপিত হয়। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপাখানা, ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কলেজ এবং ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞান কলেজ স্থাপিত হয়। স্যার আশুতােষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশ-বিদেশের বহু স্বনামধন্য পণ্ডিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে যােগদান করেন এবং এইভাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যথার্থ অর্থেই এক আন্তর্জাতিক রূপ পায়।
মূল্যায়ন : বাস্তবিকই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে একটি Centre of excellence-এ পরিণত হয়েছে। অন্তত পাঁচজন নােবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব যথাক্রমে রােনাল্ড রস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সি. ভি. রমন, অমর্ত্য সেন এবং অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় কোনাে না কোনাে সময় এই প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষভাবে যুক্ত থেকে এর গৌরব বৃদ্ধি করেছেন।
তৃতীয় অধ্যায়
প্রতিরােধ ও বিদ্রোহ: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর: প্রশ্নমান ৪
1. ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে সাওতালরা বিদ্রোহ করেছিল কেন?
উত্তর: প্রাক্-মহাবিদ্রোহ পর্বে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংঘটিত অসংখ্য কৃষক-উপজাতি বিদ্রোহগুলির মধ্যে সম্ভবত সর্বাপেক্ষা ব্যাপক বিস্তৃত তথা রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ ছিল ১৮৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দের সাঁওতাল বিদ্রোহ। নিরীহ, নির্বিবাদী সাঁওতালদের বিদ্রোহী হয়ে ওঠার পশ্চাতে ছিল একাধিক কারণ।
সাঁতাল বিদ্রোহের কারণ
(i) ভূমিরাজস্বের চাপ বৃদ্ধি: চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের ফলে সাঁওতালদের নিজস্ব বাসভূমি দামিন-ই-কো’ অঞল ব্রিটিশের খাজনা বলয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়। স্বাভাবিক পরিণামে সাঁওতালদের উপর আরােপিত হয় মাত্রাতিরিক্ত রাজস্বের চাপ। মধ্যস্বত্ত্বভােগীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সাঁওতালরা তাই বিদ্রোহকেই সমীচীন মনে করে।
(ii) মহাজনী শােষণ: মহাজন’ নামে পরিচিত বহিরাগত সুদের কারবারিরা অজ্ঞ সাঁওতালদের অসহায়তার সুযােগ নিয়ে তাদের চড়া সুদে ঋণ দিয়ে এবং চুক্তিপত্রে তদুপেক্ষা চড়া হারের উল্লেখ করে জন্মান্তরব্যাপী তাদেরকে শােষণের এক ঢালাও বন্দোবস্ত সুসম্পন্ন করতেন। মহাজনী ঋণের এই জন্মান্তর বিস্তৃত জাল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসার উদগ্র বাসনা সাঁওতালদের বিদ্রোহের পথে পরিচালিত করেছিল।
(iii) রেল-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের নির্যাতন: রেলপথ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত কর্মচারী ও ঠিকাদাররা দামিন-ই-কো’-তে এসে অত্যাচার, অবিচার শুরু করে। সাঁওতাল রমণীদের সম্রম-ও তাদের লােলুপ দৃষ্টি থেকে রক্ষা পায়নি। স্বাভিমানী সাঁওতালরা তাই বিদ্রোহকেই হাতিয়ার স্বরূপ বেছে নেয়।
(iv) ব্যবসায়ীদের কারচুপি: বহিরাগত অসাধু ব্যবসায়ীরা সাঁওতালদের সরলতা ও অজ্ঞতার সুযােগ নিয়ে প্রায়শই তাদের ঠকাতাে। কেনারাম’ নামক বাটখারা দিয়ে সঠিক ওজন অপেক্ষা বেশি দ্রব্য নিয়ে এবং ‘বেচারাম’ নামক বাটখারা দিয়ে সঠিক ওজন অপেক্ষা কম দ্রব্য দিয়ে সাঁওতালদের ঠকানাে সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছিল। এই ব্যবসায়িক কারচুপি সাঁওতালদের কাছে ক্ৰমে পরিস্ফুট হতে থাকলে তারা আর মুখ বুজে তা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না।
অন্যান্য কারণ
(i) নীলকরদের অত্যাচার;
(ii) খ্রিস্টান মিশনারিগণ কর্তৃক বলপূর্বক সাঁওতালদের ধর্মান্তরকরণের প্রচেষ্টা প্রভৃতি।
মন্তব্য: ভারতের অগণিত কৃষক-উপজাতি বিদ্রোহের ভিড়ে সাঁওতাল বিদ্রোহ এক স্বতন্ত্র স্থানের অধিকারী। অধ্যাপক নরহরি কবিরাজ যথার্থই লিখেছেন—সাঁওতাল বিদ্রোহ আপসহীন গণসংগ্রামের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।
2. টীকা লেখাে : ফরাজি আন্দোলন।
উত্তর: এদেশে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের ফলে শুরু হয় ফরাজি আন্দোলন, যা ক্রমশ রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করে।
উদ্ভব: ফরাজি আন্দোলনের সূচনা করেন হাজি শরিয়ৎ উল্লাহ, পূর্ববঙ্গের ফরিদপুরে। ফিরাজি’শব্দের অর্থ হলাে—ইসলাম নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক কর্তব্য’বা ইসলাম ধর্মের আদর্শে বিশ্বাস। হাজি শরিয়ৎ উল্লাহ ফরাজি’ নামে ধর্মীয় সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করে দরিদ্র মুসলমান কৃষক ও কারিগরদের ঐক্যবদ্ধ করেন।
লক্ষ্য: আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল, ইংরেজ অধিকৃত ‘দার-উল-হারব’ (শত্রুর দেশ) ভারতবর্ষকে দার-উল-ইসলাম (ইসলামের দেশ)-এ পরিণত করা।
মহম্মদ মুসিন-এর ভূমিকা: শরিয়ত উল্লাহের মৃত্যুর পর আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন তাঁর পুত্র মহম্মদ মুসিন। যিনি দুদু মিঞা নামেই ইতিহাসে সমধিক পরিচিত। তিনি ছিলেন সুসংগঠক ও রাজনৈতিক চেতনার অধিকারী। তিনি সাংগঠনিক কাঠামাে গড়ে তুলে, অত্যাচারী জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করেন। তিনি গ্রাম্য বিবাদে ইংরেজদের আদালতে না গিয়ে সালিশির ব্যবস্থা করেন এবং জমিদারদের করধার্য করার অধিকার অস্বীকার করেন।
বিস্তার: মহম্মদ মুসিন-এর নেতৃত্বে ফরাজি আন্দোলন ধীরে ধীরে ফরিদপুর, ঢাকা, খুলনা, ময়মনসিংহের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
অবসান: ক্রমে আন্দোলনের ব্রিটিশ বিরােধী চরিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠলে সরকার মহম্মদ মুসিনকে কারারুদ্ধ করেন। ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ মুসিন-এর মৃত্যুর পর ফরাজি আন্দোলন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নােয়ামিঞার নেতৃত্বে তা শুধুমাত্র ধর্মীয় বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকে।
গুরুত্ব: ফরাজি আন্দোলনে ধর্মীয় ভাব যুক্ত থাকলেও এটি মূলত ছিল বাংলার একটি কৃষক বিদ্রোহ। জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে নিপীড়িত কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে ফরাজিরা তাদের মধ্যে এক সংগ্রামী চেতনার জাগরণ ঘটান।
3. টীকা লেখাে: তিতুমিরের নেতৃত্বে বারাসাত বিদ্রোহ।
উত্তর: বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন মীর নিসার আলি, তিতুমির নামেই যিনি ইতিহাসে সমধিক পরিচিত। সৈয়দ আহমেদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তিনি বাংলায় ওয়াহাবি আদর্শ প্রচার করেন।
তিতুমিরের লক্ষ্য: তিতুমিরের মূল লক্ষ্য ছিল স্থানীয় অত্যাচারী জমিদার, নীলকর ও তাদের মদতদাতা ইংরেজদের বিতাড়ন এবং শশাষণমুক্ত স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা।
আন্দোলনের সূচনা: ২৪ পরগনার পুঁড়া গ্রামের অত্যাচারী জমিদার কৃয়দেব রায়, গােবরডাঙার জমিদার এবং স্থানীয় সুদখাের মহাজনদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোেষণার মধ্য দিয়ে তিতুর নেতৃত্বে আন্দোলনের সূচনা হয়।
আন্দোলনের বিস্তার: ক্ৰমে ২৪ পরগনা, নদিয়া, রাজশাহী, ঢাকা, পাবনার বিস্তীর্ণ অঞলে তিতুমিরের নেতৃত্বে ওয়াহাবি আন্দোলন দাবানলের মতাে ছড়িয়ে পড়ে। তিতুমিরের বারাসাত বিদ্রোহ জমিদার ও নীলকর বিরােধী থেকে ক্রমে প্রত্যক্ষ ব্রিটিশ বিরােধী সংগ্রামে পর্যবসিত হয়।
বাঁশের কেল্লা: জমিদারদের বিরুদ্ধে সাফল্য লাভের পর তিতুমির বারাসাতের নিকটবর্তী নারকেলবেড়িয়া গ্রামে বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করে তার সদর দপ্তর স্থাপন করেন। তিনি নিজেকে বাদশাহ’ ঘােষণা করেন এবং স্থানীয় জমিদার, নীলকর ও মহাজনদের কাছ থেকে রাজস্ব দাবি করা হয়।
বিদ্রোহের অবসান: তিতুমিরের কার্যকলাপ ব্রিটিশ শাসকের মনে ভীতির সঞ্চার করে। শেষ পর্যন্ত বড়লাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের নির্দেশে সেনাপতি স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে এক বিশাল বাহিনী ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে বাঁশের কেল্লা আক্রমণ করে। ইংরেজের কামানের গােলার আঘাতে কেল্লা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তিতুমির ও তার কয়েকজন অনুগামী যুদ্ধক্ষেত্রে বীরের ন্যায় মৃত্যুবরণ করেন।
মন্তব্য: তিতুমিরের নেতৃত্বে ওয়াহাবি আন্দোলন কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় সংকীর্ণতা দোষে দুষ্ট হলেও ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্র প্রমুখ তিতুমিরের অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তার মরণপণ সংগ্রাম স্বৈরাচার বিরােধিতার এক উজ্জ্বল ইতিবৃত্ত।
ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর: প্রশ্নমান ৮
তৃতীয় অধ্যায়
প্রতিরােধ ও বিদ্রোহ: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ
1. নীল বিদ্রোহ কেন ঘটেছিল? এই বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করাে। ৩+৫
উত্তর: প্রথম অংশ
মহাবিদ্রোহের রণধ্বনি দমিত হতে না হতেই ভারতীয় কৃষক সমাজের অসন্তোষের লাভ-বহ্নি নতুন ছিদ্র পথে নির্গত হতে শুরু করে। মহাবিদ্রোহত্তর বাংলা তথা ভারতের কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসে ১৮৫৯-৬০ খ্রিস্টাব্দের নীল বিদ্রোহ এক স্বতন্ত্র স্থানের অধিকারী।
পূর্বকথা: অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে ইংল্যান্ডে বস্ত্রশিল্পের প্রভূত অগ্রগতি ঘটে। এর সূত্রে ভারতের কোম্পানির প্রত্যক্ষ মদতে এবং নীলকরদের পরিচালনায় গড়ে ওঠে জবরদস্তিমূলক নীলচাষ ও লাভজনক নীল-বাণিজ্য। ইতিহাসসূত্র পর্যালােচনায় দেখা যায়, ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বণিক লুই বােনার্ড চন্দননগরে প্রথমে নীলচাষ শুরু করেন। তারপর ইংরেজ বণিক কার্ল ব্ল্যাম ভারতে প্রথম নীল শিল্প গড়ে তােলেন। ক্রমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রপ্তানি বাণিজ্যে নীল হয়ে ওঠে প্রধান দ্রব্য।
নীলবিদ্রোহর কারণ
দাদন প্রথা: নীলকররা নিজ জমিতে নীলচাষ (এলাকা চাষ) অপেক্ষা কৃষকের জমিতে নীলচাষ(বে-এলাকাচাষ) বেশি লাভজনক হওয়ায় তারা দরিদ্র চাষিকে বিঘা প্রতি মাত্র দুই টাকা দাদন দিয়ে তার সর্বোৎকৃষ্ট জমিতে নীলচাষে বাধ্য করতাে এবং উৎপন্ন নীল নীলকরদের কাছে। বিক্রি করতে বাধ্য করতাে। ফলে কৃষকের স্বাধীনতা ও মুনাফা দুই-ই কমে যেত।
পঞম আইন: লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮৩০ সালে পঞ্চম আইন জারি করে নীলকরদের সঙ্গে নীলচাষিদের চুক্তিভঙ্গ করাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসাবে ঘােষণা করেন। ফলে চাষিদের ওপর নীলকর সাহেবদের অত্যাচার আইনি বৈধতা পায়।
লাভজনক চাষে বাধা: জমিতে ধান, তামাক, কলাই প্রভৃতির চাষ লাভজনক হলেও চাষিদের বলপূর্বক নীলচাষে বাধ্য করা হতাে।
নীলকরদের অত্যাচার: নীলচাষে অরাজি কৃষকদের ওপর নীলকর সাহেবদের অকথ্য অত্যাচার-প্রহার, হত্যা, গৃহদাহ, বলপূর্বক আটক, স্ত্রী-কন্যাদের ওপর লাঞ্ছনা কৃষক সমাজকে বিদ্রোহের পথে পরিচালিত করেছিল।
পূর্ববর্তী বিদ্রোহগুলির প্রভাব: পূর্ববর্তী বিভিন্ন কৃষক ও উপজাতি বিদ্রোহ এবং সর্বোপরি মহাবিদ্রোহের মহান প্রেরণা নীলচাষিদের বিদ্রোহে অনুপ্রাণিত করেছিল। উপরিউক্ত কারণগুলির ফলস্বরূপ ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের শেষর দিকে নদিয়ার কৃষ্ণনগরের চৌগাছা গ্রামে বিদ্রোহের বহ্নিশিখা জ্বলে ওঠে।
দ্বিতীয় অংশ
ইতিহাস সূত্র পর্যালােচনায় নীলবিদ্রোহের একগুচ্ছ বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে।
নীলবিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য
গণসংগ্রাম: নীল বিদ্রোহ ছিল প্রকৃত অর্থেই গণসংগ্রাম। এই বিদ্রোহের মাধ্যমেই সর্বপ্রথম কৃষক, জমিদার, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। অমৃতবাজার পত্রিকায় শিশিরকুমার ঘােষ লেখেন—‘নীল বিদ্রোহই সর্বপ্রথম ভারতবাসীকে সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রয়ােজনীয়তা শিখিয়েছিল।
শিক্ষিত সমাজের অংশগ্রহণ: শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজ নীলবিদ্রোহে। পরােক্ষ নেতৃত্বদানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সমকালীন পত্রপত্রিকায় নীলকরদের বিরুদ্ধে সমালােচনার ঝড় ওঠে। সমাচার চন্দ্রিকা, সমাচার দর্পণ, তত্ত্ববােধিনী প্রভৃতি সংবাদপত্র এবং তাদের সম্পাদকেরা বিদ্রোহের খবরাখবর নিয়মিত তুলে ধরেন। হরিশচন্দ্র মুখােপাধ্যায় সম্পাদিত ইংরাজি সাপ্তাহিক হিন্দু প্যাট্রিয়ট নীলচাষিদের মুখপত্রে পরিণত হয়। বাঙালির রঙ্গমঞেও সেদিন লেগেছিল প্রতিবাদের সুর। নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র রচনা করেন নীলদর্পণ। আর মাইকেল মধুসুদন এর ইংরাজি ভাষান্তর ঘটিয়ে এবং ভারত প্রেমিক খ্রিস্টান পাদ্রী জেমস ল তা নিজ নামে প্রকাশ করে শ্বেতাঙ্গ সমাজের কাছে নীলচাষিদের। অশ্রুসজল কাহিনি তুলে ধরেন।
নিম্নবর্গের মানুষের নেতৃত্ব: জমিদার শ্রেণির একাংশ এই বিদ্রোহের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকলেও বিদ্রোহের মূল নেতৃত্ব উঠে এসেছিল কৃষকসমাজের মধ্য থেকেই। কাদের মােল্লা, বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস, দিগম্বর বিশ্বাস প্রমুখ নিম্নবর্গের মানুষের হাতেই ছিল বিদ্রোহের রথের রশি।
বিদ্রোহের সফলতা: ভারতে অগণিত কৃষক বিদ্রোহের ভিড়ে নীল বিদ্রোহের সফলতা অন্যান্য বিদ্রোহকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। বিদ্রোহের ব্যাপকতায় বাধ্য হয়ে সরকার ১৮৬০ সালে নীলকমিশন গঠন করে এবং নীলচাষকে নীলচাষিদের ইচ্ছাধীন বিষয়ে পরিণত করে। এই বিদ্রোহ প্রমাণ করে যে, ঐক্যবদ্ধ গণ আন্দোলনের কাছে স্বৈরাচার মাথা নত করতে বাধ্য।
ধর্মঘটের প্রথম নজির: নীল বিদ্রোহ ছিল ভারত ইতিহাসে ধর্মঘটের প্রথম নজির। নীলচাষ করতে অস্বীকার করে নীলচাষিরা গান্ধিজির জন্মের বহুপূর্বেই ধর্মঘটের সফল নজির সৃষ্টি করেছিল।
মূল্যায়ন: অমৃতবাজার পত্রিকার মতে, এই বিদ্রোহ অর্ধমৃত বাঙালির শিরায় স্বাধীনতার উষ্ণ শােণিত প্রবাহিত করে।
চতুর্থ অধ্যায়
সংঘবদ্ধতার গােড়ার কথা বিশ্লেষণ ও বৈশিষ্ট্য
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর: প্রশ্নমান ৪
1. হিন্দুমেলার উদ্দেশ্য কী ছিল? | টীকা লেখাে : হিন্দুমেলা
উত্তর: ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ এপ্রিল চৈত্র সংক্রান্তির দিন নবগােপাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু প্রমুখের উদ্যোগে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় চৈত্র মেলা’, যা পরবর্তীকালে ‘হিন্দুমেলা নামে পরিচিত হয়ে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে এক উল্লেখযােগ্য ভূমিকা পালন করে।
হিন্দুশলার উদ্দশ্য
ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার হিন্দুমেলার তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। যথা—জাতীয়তাবাদের প্রসার ঘটানাে, দেশাত্মবােধের জাগরণ এবং হিন্দুদের মধ্যে এক আত্মনির্ভরশীল মনােভাব গঠন করা। হিন্দুমেলার উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে এর প্রথম সম্পাদক স্বয়ং গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন—“আমাদের এই মিলন সাধারণ ধর্মকর্মের জন্য নহে, কোনাে বিষয় সুখের জন্য নহে, কোনাে আমােদ-প্রমােদের জন্যও নহে, ইহা স্বদেশের জন্য, ইহা ভারতভূমির জন্য।”
হিন্দুমেলার প্রধান উদ্দেশ্যগুলি ছিল সাধারণ মানুষ বিশেষকরে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে হিন্দুধর্মের অতীত গৌরবগাথা ছড়িয়ে দেওয়া, দেশীয় ভাষাচর্চা করা, জাতীয় প্রতীকগুলিকে মর্যাদা দেওয়া, প্রাচীন হিন্দুধর্মের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আদর্শে সবাইকে অনুপ্রাণিত করা, গােপনে হিন্দু যুবকদের মধ্যে বৈপ্লবিক ভাবধারা জাগিয়ে তােলা, হিন্দু জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং আত্মনির্ভরশীল ভারতবর্ষ প্রতিষ্ঠা করা।
হিন্দুমেলা শরীরচর্চা, অশ্বচালনা প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষা-সাহিত্য-শিল্প-সংগীত-স্বাস্থ্য প্রভৃতির উন্নতি ঘটিয়ে আত্মনির্ভরতা ও ঐক্যবদ্ধতার মাধ্যমে যুবসমাজকে ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা অর্জনের উপযােগী করে গড়ে তুলতে চেয়েছিল। তবে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে প্রত্যক্ষভাবে প্রবেশ না করে হিন্দুমেলা’ দেশাত্মবোেধ প্রচারকেই অধিক প্রাধান্য দিয়েছিল।
সর্বোপরি, দেশীয় জিনিসের প্রদর্শনী, দেশাত্মবােধক সঙ্গীত, বক্তৃতার আয়ােজন প্রভৃতিতেও হিন্দুমেলার সদস্যরা অগ্রণী ছিলেন। হিন্দুমেলার অধিবেশনে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত ও গীত ‘মিলে সবে ভারত সন্তান’ গানটি বিপুল উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল। হিন্দুমেলা দেশীয় বিদ্যাশিক্ষার উন্নতি ও প্রসারে নিয়ােজিত স্বদেশীদের সম্মান জানানাে এবং তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলিকে জনসমক্ষে প্রচারের জন্য ন্যাশনাল পেপার’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করে।
মন্তব্য: নামমাহাত্ম্যে অনেকে এই প্রতিষ্ঠানকে সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দিলেও বাস্তবে তা যথার্থ নয়। বস্তুতপক্ষে, সেদিন ভারতবাসীর জাতীয়চেতনা ছিল অস্পষ্ট, তখন হিন্দু ও ‘জাতীয়’ শব্দ দুটি ছিল সমার্থক। হিন্দু শব্দের সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প তখনও যুক্ত হয়নি। তাই হিন্দুমেলাকে জাতীয়তাবােধের উদ্বোধনের অন্যতম সহায়ক উপাদানরূপে বিচার করাই ইতিহাস সম্মত।
2. ১৮৫৭-এর মহাবিদ্রোহকে কি সামন্তশ্রেণির বিদ্রোহ বলা যায় ?
উত্তর: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষের বুকে ঘটে যাওয়া বহুচর্চিত বিদ্রোহটির প্রকৃতি বা চরিত্র নির্ধারণে এর সার্ধ-শতবৎসর অতিক্রান্তেও কোনাে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভবপর হয়নি। স্বভাবতই তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক মহলে উঠে এসেছে নানান পরস্পর বিরােধী ব্যাখ্যা।
সামন্ত বিদ্রোহ
প্রবক্তা: ডঃ রজনীপাম দত্ত, আর. সি. মজুমদার, ড. সুরেন্দ্রনাথ সেন, শশিভূষণ চৌধুরি প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ ১৮৫৭-এর বিদ্রোহকে ‘সামন্ত বিদ্রোহ’ আখ্যা দিয়েছেন।
মূল বক্তব্য: এঁদের মতে, গদিচ্যুত ও রাজ্যচ্যুত সামন্তরাজারা (যথা—নানাসাহেব, তাতিয়া টোপি, লক্ষ্মীবাঈ প্রমুখ) নিজ নিজ স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে নিজ নিজ অঞ্চলে জনগণকে খেপিয়ে তুলে বিদ্রোহে সামিল হয়েছিলেন। ইংরেজ শাসন ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতি সামন্তপ্রভুদের মনে ভীতির সঞ্চার করেছিল এবং তাদের ক্ষমতা খর্ব করেছিল। তাই দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে সামনে রেখে তারা পুরাতন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামাের পুনঃপ্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন। তাদের হাতেই ছিল বিদ্রোহের মূল নেতৃত্ব। ডঃ মজুমদার এই বিদ্রোহকে ক্ষয়িষ্ণু অভিজাত তন্ত্র ও মৃতপ্রায় সামন্ত শ্রেণির মৃত্যুকালীন আর্তনাদ’ বলে আখ্যায়িত করেছিল। তিনি আরও লিখেছেন— “The First National War of Independence’ is neither ‘first’ nor ‘national nor the war of independence”
সমালােচনা: অন্যদিকে কার্ল মার্কস, সুশােভন সরকার, বীর সাভারকার প্রমুখ ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিকগণ ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে ‘সামন্ত বিদ্রোহ’ হিসাবে দেখতে নারাজ। তাঁদের মতে, সিপাহিদের দ্বারা বিদ্রোহের সূচনা হলেও এবং বিদ্রোহের নেতৃত্ব সামন্তশ্রেণির হাতে থাকলেও অচিরেই এই বিদ্রোহের বিপুল বিস্তার, জনগণের বিপুল সমর্থন ও অংশগ্রহণ, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য, বিদ্রোহ দমনে সরকারের ব্যাপক যুদ্ধ পরিচালনা প্রভৃতি এই বিদ্রোহকে গণসংগ্রামের চরিত্র দান করেছে। বীর সাভারকার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই বিদ্রোহকে ভারতের স্বাধীনতার প্রথম সংগ্রাম’ বলে অভিহিত করেছেন।
মন্তব্য: বস্তুতপক্ষে ১৮৫৭- বিদ্রোহ কোন ঐতিহাসিকের নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক বক্তব্য মেনে পরিচালিত হয়নি। গতির আবেগে বিদ্রোহ সমস্ত তত্ত্বকেই সংমিশ্রিত করেছিল। তাই ঐতিহাসিক c. A. Bayly কে উদ্ধৃত করেই আলােচনার ইতি টানা যায়— “The Indian Rebellion of 1857 was not one movement………it was many.”
3. মহারাণীর ঘােষণাপত্রের ঐতিহাসিক তাৎপর্য কী?
উত্তর: ১৮৫৭ খ্রিঃ মহাবিদ্রোহের অভিঘাতে ভারতে কোম্পানির শাসনের উপর যবনিকা নেমে আসে, পরিবর্তে সূচিত হয় ইংল্যান্ডের মহারাণীর প্রত্যক্ষ শাসন। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১ নভেম্বর এলাহাবাদে অনুষ্ঠিত এক দরবারে এক রাজকীয় ঘােষণাপত্র জারি করে মহারাণী ভিক্টোরিয়া ভারতের শাসনভার স্বহস্তে তুলে নেন এবং ভারতীয় শাসনব্যবস্থায় নতুন নীতি ও আদর্শ প্রবর্তনের কথা ঘােষণা করে জনসাধারণকে আশ্বস্ত করেন।১৮৫৮র ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে মহারাণীর ঘােষিত এই ঐতিহাসিক প্রচারপত্র মহারাণীর ঘােষণাপত্র’ নামে পরিচিত।
মহারাণীর ঘােষণাপত্র মহারাণীর ঘােষণায় বলা হয় যে,
(i) ভারতবাসীর ধর্মীয় ও সামাজিক কোনাে ব্যাপারেই সরকার কোনােরূপ হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে;
(ii) প্রত্যেক ভারতবাসী ধর্মীয় স্বাধীনতা ভােগ করবে;
(iii) জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে যােগ্যতাসম্পন্ন সকল ভারতবাসীই সরকারি চাকুরীতে নিযুক্ত হতে পারবে;
(iv) দেশীয় রাজারা দত্তকপুত্র গ্রহণের অধিকার ফিরে পাবেন;
(v) সাম্রাজ্যবিস্তার নীতি পরিত্যক্ত হবে;
(vi) স্বত্ববিলােপ নীতি-ও সরকার প্রত্যাহার করে নেবে;
(vii) দেশীয় রাজাদের আশ্বস্ত করা হয় যে, কোম্পানির সাথে তাদের এযাবৎ স্বাক্ষরিত সকল চুক্তি ও সন্ধিপত্রগুলি যথাযথ রক্ষিত হবে প্রভৃতি।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য: মহারাণীর ঘােষণাপত্র ভারতে দীর্ঘ একশত বছরের কোম্পানির রাজত্বের অবসান ঘটায়, পরিবর্তে সূচিত হয় ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রত্যক্ষ শাসন। বস্তুতপক্ষে, ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দের রেগুলেটিং অ্যাক্ট থেকে ধাপে ধাপে ক্ষমতা হস্তান্তরের যে প্রক্রিয়া চলছিল, ইতিহাসের এই পর্বে তা সম্পূর্ণ হয়। ভাইসরয়’ নামধারী রাজপ্রতিনিধির হাতে শাসনভার অর্পিত হয়।
সাধারণ ভারতবাসীর কাছে মহারাণীর ঘােষণাপত্র আসলে ছিল গালভরা প্রতিশ্রুতির সংকলন মাত্র। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণােদিত এই ঘােযণায় যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার প্রায় কোনােটিই ভবিষ্যতে রক্ষিত হয়নি। ভারতবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য ন্যায় বিচার ও প্রতিনিধিত্ব মূলক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের কোনাে প্রচেষ্টা এতে ছিল না, বরং তা ছিল নতুন পাত্রে পুরাতন পানীয় পরিবেশনের অপচেষ্টা মাত্র। বাস্তবিকই শাসকের নাম ফলকের পরিবর্তন ব্যতীত শাসনের চরিত্রগত কোনােরূপ পরিবর্তন সাধিত হয়নি। ডঃ বিপনচন্দ্র একে রাজনৈতিক ধাপ্পাবাজি’ বলেই আখ্যায়িত করেছেন।
4. বর্তমান ভারত’ কীভাবে জাতীয়তাবাদী চেতনাবিস্তারে সহায়তা করেছিল?
উত্তর: বাংলা সাহিত্যমালায় স্বদেশচিন্তা ও জাতীয়তাবােধের জাগরণের এক উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত হলাে স্বামী বিবেকানন্দের বর্তমান ভারত।
প্রকাশ: স্বামীজির বর্তমান ভারত’ প্রথমে পাক্ষিক উদ্বোধন’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। পরে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে তা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
বিষয়বস্তু: বর্তমান ভারত’-এ স্বামীজিভারতও বিশ্বের ইতিহাস মন্থন করে ইতিহাসের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে তার ধারণাকে সংহত আকারে প্রকাশ করেছেন।
শূদ্রের জাগরণ: বর্তমান ভারত’-এ ভারতবর্ষের ইতিহাস বিশ্লেষণে স্বামীজিতার মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ইতিহাস সর্বদা শ্রেণি-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। তার মতে পৃথিবীর সর্বত্রই ব্রাম্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারটি বর্ণ পর্যায়ক্রমে পৃথিরীশাসন করবে। প্রথম দুটি বর্ণের শাসনকাল শেষ হয়েছে, তৃতীয় বর্ণ বৈশ্যের শাসনকালও সমাপ্তির মুখে। চতুর্থ বর্ণ শূদ্রের শাসন অবশ্যম্ভাবী এবং তা ঐতিহাসিক সত্য।
দেশমন্ত্র: গ্রন্থের উপসংহারে স্বামীজি দেশবাসীকে স্বদেশমন্ত্র উপহার দিয়েছেন। দেশের যুবসমাজের প্রতি তাঁর উদাত্ত আহ্বান—“হে ভারত, ভুলিও না তুমি জন্ম হইতেই মায়ের জন্য বলি প্রদত্ত-ভুলিও না নীচ জাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর, তােমার রক্ত, তােমার ভাই।” দেশ ও দেশবাসীর সাথে একাত্ম হয়ে অনবদ্য ভাষায় তিনি লিখেছেন—“ভারতবর্ষ আমার ভাই, ভারতবাসী আমার প্রাণ—ভারতের মৃত্তিকা আমার স্বর্গ, ভারতের কল্যাণ আমার কল্যাণ।” স্বামীজির স্বদেশপ্রেম এভাবেই পূর্ণতা পেয়েছে স্বদেশমন্ত্রে।
মন্তব্য: স্বামীজির বর্তমান ভারত’-এ অখণ্ড ভারতমূর্তি আলােকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তাঁর প্রেরণাতেই দেশপ্রেম ধর্মের বিকল্প হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তাকে যথার্থই ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জনক’ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
5. অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভারতমাতা’ চিত্র কীভাবে জাতীয়তাবাদী চেতনা বিস্তারে সহায়তা করেছিল?
উত্তর: ভারতবাসীর স্বদেশচিন্তা কেবলমাত্র কাব্য, নাটক, উপন্যাস আর প্রবন্ধের রেখায় প্রকাশিত হয়নি; ভারতীয় চিত্রকলাতেও সেদিন লেগেছিল স্বাদেশিকতার ছোঁয়া। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভারতমাতা’ চিত্রটি দেশপ্রেমের এরকমই এক মহাযজ্ঞ।
প্রেক্ষাপট : ১৯০৫ সালের স্বদেশি আন্দোলনের উন্মাদনার দিনে সারা বাংলাদেশ যখন মাতৃবন্দনায় উদ্বেল হয়ে উঠেছে সেই প্রেক্ষাপটে ১৯০৫ সালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর অঙ্কন করলেন বঙ্গমাতা’র ছবি। পরে ভগিনি নিবেদিতা এর নাম দেন ভারতমাতা।
চিত্র বর্ণনা: গৈরিক বস্ত্রে মণ্ডিতা এই মাতৃমূর্তি চতুর্ভূজা। তার চার হাতের এক-একটিতে ধরা আছে ধানের শিষ, শ্বেতবস্ত্র, পুস্তক এবং জপের মালা অর্থাৎ সন্তানের প্রতি মায়ের দান অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা ও দীক্ষা।
জাতীয়তাবােধের জাগরণ: অবনীন্দ্রনাথের ‘ভারতমাতা’ নয়া জাতীয়তাবাদের প্রতীকে পরিণত হয়, দেশবাসী মাতৃমূর্তি পায়। স্বদেশি বাংলায় এই ছবি নিয়ে শােভাযাত্রা বের হতাে। এই চিত্রের মধ্য দিয়ে অভয় ও সমৃদ্ধিদানকারী মাতৃদেবীর রূপকে কল্পনা করা হয়েছে। ভারতমাতা এখানে একাধারে মানবী ও দেবীরূপে কল্পিত হয়েছেন। অবনীন্দ্রনাথের ‘ভারতমাতা’তপস্বীনি। তিনি কল্যাণময়ী ও করুণারুপিনী।
সমালােচনা: অবনীন্দ্রনাথের ‘ভারতমাতা’-কে ব্রাম্মসমাজের অনেকেই মূর্তিপূজার বাড়াবাড়ি বলে সমালােচনা করেছেন। মুসলিম সমাজেও ভারতমাতার হিন্দু ধর্মীয়রূপকে সমালােচনায় বিদ্ধ করা হয়েছে।
মন্তব্য: নানাবিধ সমালােচনা সত্ত্বেও পরিশেষে বলা যায় জাতীয়তাবােধের উজ্জীবনেও স্বাদেশিকতার প্রচারেঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভারতমাতা চিত্র নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় চিত্রকলার পুনর্জন্ম ঘটেছে তাঁরই হাতে। তিনি যথার্থই ‘নব্যবঙ্গীয় চিত্রকলার অগ্রদূত।
চতুর্থ অধ্যায়
সংঘবদ্ধতার গােড়ার কথা বিশ্লেষণ ও বৈশিষ্ট্য
1. সংক্ষেপে মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) চরিত্র বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষের বুকে ঘটে যাওয়া বহুচর্চিত বিদ্রোহটির প্রকৃতি বা চরিত্র নির্ধারণে এর সার্ধ-শতবৎসর অক্ৰিান্তেও কোনাে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভবপর হয়নি। স্বভাবতই তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক মহলে উঠে এসেছে নানান পরস্পর বিরােধী ব্যাখ্যা।
১৮৫৭-র বিদ্রোহ প্রকৃতি
(i) সিপাহি বিদ্রোহ
প্রবক্তা: চার্লস রেকস, স্যার জন লরেন্স, দাদাভাই নৌরজি, দুর্গাদাস ব্যানার্জী প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।
মূল বক্তব্য: এই তত্ত্বের প্রবক্তাদের মতে, ১৮৫৭-র বিদ্রোহ মুখ্যত ছিল একটি ‘সিপাহি বিদ্রোহ’। সিপাহিদের অসন্তোষ থেকেই বিদ্রোহের সূচনা ও প্রসার। অসামরিক লােকেদের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য এবং মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি আইন-শৃঙ্খলার অবনতির সুযােগ নিয়েছিলেন মাত্র। কোনাে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের লক্ষ্যে আন্দোলন পরিচালিত হয়নি, অঞ্চলভেদে বিদ্রোহের নেতাদের চাওয়া-পাওয়া ছিল ভিন্ন। সিপাহিদের সঙ্গেও বিদ্রোহের প্রধান নেতাদের কোনাে যােগাযোেগ ছিল না। ভারত থেকে ইংরেজ শাসন উৎখাতের লক্ষ্যে কোনাে কেন্দ্রীয় সংগঠনও গড়ে তােলা হয়নি। দেশীয় রাজাদের অনেকেই, এমনকি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজও আন্দোলন থেকে দূরে ছিল। আবার শিখ, গােখা প্রভৃতি যােদ্ধা জাতি ভারতে পুনরায় মুঘল শাসনের দুর্দিন’ ফিরে আসার আশঙ্কায় সরাসরি বিদ্রোহ দমনে সরকারকে সাহায্য করেছিল। সুতরাং উপরিউক্ত যুক্তির আলােকে এই শ্রেণির তাত্ত্বিকগণ ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে ‘ সিপাহি বিদ্রোহ’ অপেক্ষা অধিক কিছু আখ্যা দিতে নারাজ।
(ii) জাতীয় বিদ্রোহ
প্রবক্তা: কার্ল মার্কস, নর্টন, ডাফ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।
মূল বক্তব্য: এঁদের বক্তব্যের নির্যাস হলাে–সিপাহিদের দ্বারা বিদ্রোহের সূচনা হলেও অচিরেই এর বিপুল সম্ভার, জনগণের বিপুল সমর্থন ও অংশগ্রহণ, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য, বিদ্রোহ দমনে সরকারের ব্যাপক যুদ্ধ পরিচালনা প্রভৃতি এই বিদ্রোহকে গণসংগ্রামের চরিত্র দান করেছে। তারা দেখিয়েছেন, দেশের উত্তর, মধ্য ও উত্তর-পশ্চিম অংশে বিশেষত অযােধ্যা, দিল্লি, রােহিলখণ্ড প্রভৃতি অঞ্চলে এই বিদ্রোহ কার্যত গণসংগ্রামের রূপ নেয়। মার্কসের পরিভাষায়—“(জন বুল) যাকে সেনা বিদ্রোহ মনে করেছেন, সেটা আসলে জাতীয় বিদ্রোহ।”
(iii) স্বাধীনতার প্রথম সংগ্রাম:
প্রবক্তা: প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী বিনায়ক দামােদর সাভারকার তার Indian War of Independence’ গ্রন্থে এই তত্ত্বের অবতারণা করেছেন।
মূল বক্তব্য : ১৮৫৭-র বিদ্রোহকে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বাধীনতার প্রথম সংগ্রাম বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে ১৮৫৭-র বিদ্রোহেই প্রথম জাতি-ধর্ম-বর্ণ-পেশা-শ্রেণি নির্বিশেষে আপামর ভারতবাসী একই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে, একই শত্রুর মােকাবিলায় সামিল হয়েছিল। ভারত থেকে অত্যাচারী ইংরেজ শাসনের উৎপাটন ছিল তাদের সাধারণ লক্ষ্য।
(iv) সামন্ত বিদ্রোহ :
প্রবক্তা : ডঃ রজনীপাম দত্ত, আর. সি. মজুমদার প্রমুখ মার্কসবাদী ঐতিহাসিকগণ।
মূল বক্তব্য : এঁদের মতে, গদিচ্যুত ও রাজ্যচ্যুত সামন্তরাজারা (যথা—নানাসাহেব, তাতিয়া টোপি, লক্ষ্মীবাঈ প্রমুখ) নিজ নিজ স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে নিজ নিজ অঞ্চলে জনগণকে খেপিয়ে তুলে বিদ্রোহে সামিল হয়েছিলেন। ডঃ মজুমদার এই বিদ্রোহকে ক্ষয়িষ্ণু অভিজাত তন্ত্র ও মৃতপ্রায় সামন্ত শ্রেণির মৃত্যুকালীন আর্তনাদ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি আরও লিখেছেন – The First National War of Independence’ is neither ‘first nor ‘national’ nor ‘the war of independence.”
মন্তব্য : বস্তুতপক্ষে ১৮৫৭-র বিদ্রোহ কোনাে ঐতিহাসিকের নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক বক্তব্য মেনে পরিচালিত হয়নি। গতির আবেগে বিদ্রোহ সমস্ত তত্ত্বকেই সংমিশ্রিত করেছিল। তাই ঐতিহাসিক C.A. Bayly-কে উদ্ধৃত করেই আলােচনার ইতি টানা যায়— “The Indian Rebellion of 1857 was not one movement….it was many.”
2. উনিশ শতকে লেখা ও রেখার মাধ্যমে কীভাবে ভারতে জাতীয়তাবাদের জাগরণ ঘটেছে?
উত্তর: পৃথিবীর যে কোনাে দেশে স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারা বিকাশের সঙ্গে সেই দেশের দেশাত্মবােধক বা জাতীয়তাবাদী সাহিত্যের সম্পর্ক অতি ঘনিষ্ঠ। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দেশাত্মবােধক সাহিত্যের বিকাশ ভারত ইতিহাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কাব্য, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ—সাহিত্যের সর্বক্ষেত্রেই সেদিনের মূল সুর ছিল দেশপ্রেম। ভারতীয় চিত্রকলাতেও সেদিন লেগেছিল স্বাদেশিকতার ছোঁয়া। ভারতের জাতীয় জাগরণে এইসব গ্রন্থ এবং চিত্রকলার গুরুত্ব অপরিসীম।
লেখায় জাতীয়তাবাদের বিকাশ
এই অংশে বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নে উল্লেখিত ‘আনন্দ মঠ’, বর্তমান ভরত’ ও ‘গােরা উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত আলােচনা করাে।
বেখায় জাতীয়তাবাদের বিকাশ
এই অংশে বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নে উল্লেখিত ‘ভারতমাতা’ও গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্র প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলােচনা করাে।
মূল্যায়ন: মধ্য-উনিশ শতকে ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ব্রিটিশ শাসনের এক অনিচ্ছাকৃত সুফল। ঔপনিবেশিক প্রশাসন সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে যে কঠোর দমন মূলক স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিল, তার অনিবার্য ফলস্বরূপ ভারতবাসীর জাতীয়তাবাদী চেতনা ফুটে বেরােয় সাহিত্য ও চিত্রকলায়। বি: দ্র. পরীক্ষায় যে কোনাে একটি অংশের আলােচনা চাওয়া হলে প্রদত্ত উত্তরের ভূমিকা ও মূল্যায়ন অপরিবর্তিত রেখে অন্য অংশটি পরিহার করাে।
পঞ্চম অধ্যায়
বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ :বৈশিষ্ট্য ও পর্যালােচনা
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর: প্রশ্নমান 8
1. বাংলায় কারিগরি শিক্ষার বিকাশে ‘বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের কী ভূমিকা ছিল ?
উত্তর: বঙ্গভঙ্গ-বিরােধী জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের অঙ্গরূপে গড়ে ওঠে বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট।
প্রতিষ্ঠা: বিশিষ্ট আইনজীবি ও শিক্ষা-দরদি তারকনাথ পালিতের উদ্যোগে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
উদ্দেশ্য : এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিদেশি নিয়ন্ত্রণ-মুক্ত শিক্ষা-ব্যবস্থার প্রচলন এবং বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার।
পৃষ্ঠপােষকগণ : এই শিক্ষায়তনের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন প্রমথনাথ বসু এবং প্রথম সভাপতি নিযুক্ত হন রাসবিহারী ঘােষ। এছাড়াও মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দী, ভূপেন্দ্রনাথ বােস, নীলরতন সরকার প্রমুখ শিক্ষাব্রতী প্রথম থেকেই এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপােষকতা করেন।
পাঠ্যক্রম : প্রথমদিকে এখানে দুই রকমের পাঠ্যক্রম চালু হয়। একটি ছিল তিন বছরের অন্তর্বর্তী পাঠ্যক্রম। অপরটি ছিল চার বছরের মাধ্যমিক পাঠ্যক্রম। প্রবেশিকা পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ ছাত্ররাও এখানে অন্তর্বর্তী পাঠ্যক্রমে ভর্তি হওয়ার সুযোেগ পেত। এখানে গ্রন্থ প্রকাশনা, রং মাখানাে, ছুতােরের কাজ, বিভিন্ন ধরনের খােদাই করা, সাবান তৈরি, চামড়া ট্যান করা প্রভৃতি শেখানাে হতাে। প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা মাধ্যমিক পাঠ্যক্রমে ভর্তির সুযােগ পেত। এদের পাঠ্যক্রমের তিনটি প্রধান বিষয় ছিল—যন্ত্র বিজ্ঞান ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র বিজ্ঞান, ফলিত রসায়ন এবং ভূ-বিদ্যা। প্রমথ বসু, শরৎ দত্ত, প্রফুল্ল মিত্র প্রমুখ খ্যাতনামা শিক্ষক এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
সমন্বয় : ১৯১০ সালে এই প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষা পরিষদের সঙ্গে মিশে যায়। আর স্বাধীনতার পর ১৯৫৫ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়।
মন্তব্য : স্বদেশি যুগের এই বিজ্ঞান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে নিঃসন্দেহে অঙ্কুরিত হয়েছে স্বদেশবােধ ও জাতীয়তা। ঔপনিবেশিক শিক্ষার পুতুল গড়ার কল ভেঙে প্রকৃত মানুষ গড়ার শপথ নিয়েছিল এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এর সঙ্গে যুক্ত শিক্ষাব্রতীরা।
2. বিজ্ঞানচর্চার বিকাশে ‘কলকাতা বিজ্ঞান কলেজের কীরূপ ভূমিকা ছিল ?
উত্তর: আধুনিক বিজ্ঞানচর্চা এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় মৌলিক গবেষণার উদ্দেশ্যে ঔপনিবেশিক বাংলা তথা ভারতে যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যে কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ ছিল অগ্রগণ্য।
প্রতিষ্ঠা: স্যার আশুতােষ মুখােপাধ্যায়ের উদ্যোগে এবং তারকনাথ পালিত ও রাসবিহারী ঘােষের অর্থানুকূল্যে ১৯১৪ সালে কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
বহুমুখী বিজ্ঞানচর্চা : বিশুদ্ধ বিজ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণার উদ্দেশ্যে কলকাতা বিজ্ঞান কলেজে একে একে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা, পরিবেশ বিজ্ঞান প্রভৃতি বিভিন্ন বিভাগ খােলা হয়।
মৌলিক গবেষণা: বিজ্ঞানচর্চার এই মুক্ত অঙ্গনে শিক্ষার্থী ও গবেষকরা বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় মৌলিক গবেষণার সুযােগ পান। ফলে বিজ্ঞানচর্চায় যথেষ্ট মাননান্নয়ন ঘটে। গবেষক ছাত্রদের জন্য এখানে আটটি বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়।
খ্যাতনামা শিক্ষার্থীগণ : কলকাতা বিজ্ঞান কলেজে পড়াশােনা এবং বিজ্ঞান সাধনা করে বহু শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে জগৎজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন। এই কৃতী ছাত্রগােষ্ঠীর মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ বােস, মেঘনাদ সাহা প্রমুখ ছিলেন বিশেষ উল্লেখযােগ্য।
খ্যাতনামা শিক্ষকগণ: স্বদেশি বাংলার বহু স্বনামধন্য শিক্ষক ও বিজ্ঞানীগণ এই শিক্ষায়তনে শিক্ষাদান করেন। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, ডঃ চন্দ্রশেখর ভেঙ্কটরমন প্রমুখ ছিলেন এই প্রথিতযশা শিক্ষকদের মধ্যে অন্যতম। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এখানে বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে এর যােগসূত্র স্থাপিত হয়।
মন্তব্য: অধ্যাপনা, গবেষণা ও পড়াশােনার জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ওই কলেজে যােগ দেন অধ্যাপক, গবেষক ও ছাত্রগণ। তাঁদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এই প্রতিষ্ঠান। স্বদেশি যুগের বাংলা তথা ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
3. বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার বিকাশে ড.মহেন্দ্রলাল সরকারের কিরূপ অবদান ছিল?
অথবা
টীকা লেখাে : “ইন্ডিয়ান অ্যাসােসিয়েশন ফর ‘দ্যা কাল্টিভেশন অব সায়েন্স।
উত্তর: কায়েমী স্বার্থরক্ষাকারী ও প্রভুত্ববাদী ঔপনিবেশিক বিজ্ঞানচর্চার প্রেক্ষাপটে ভারতীয়দের মধ্যে আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার সম্প্রসারণ এবং জাতীয় বিজ্ঞান গবেষণাগার নির্মাণে এগিয়ে এসেছিলেন কলকাতা মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় এম. ডি. ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার। পেশায় চিকিৎসক মহেন্দ্রলাল সরকার মানুষের অন্ধবিশ্বাস দূর করে তাদের যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞান মনস্ক হওয়ার পরামর্শ দন। বিজ্ঞানের অধ্যাপক ফাদার ইউজিন লফো-র সহায়তায় ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন ইন্ডিয়ান অ্যাসােসিয়েশন ফর দ্যা কাল্টিভেশন অব সায়েন্স (আই. এ. সি. এস) বা ভারতবর্ষীয় বিজ্ঞান সভা।
বিশুদ্ধ বিজ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় মৌলিক গবেষণা, বিজ্ঞান বিষয়ক বক্তৃতার আয়ােজন প্রভৃতিতে এই প্রতিষ্ঠান তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। আই. এ. সি. এস-এর নিজস্ব পত্রিকা ইন্ডিয়ান জার্নাল অব ফিজিক্স’-সহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিজ্ঞান পত্রিকায় এখানকার বিজ্ঞানীদের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হতাে। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, স্যার আশুতােষ মুখােপাধ্যায়, চন্দ্রশেখর ভেঙ্কটরমন, মেঘনাদ সাহা প্রমুখ খ্যাতনামা বিজ্ঞানী ও গবেষক নানা সময়ে এই প্রতিষ্ঠানে গবেষণাকর্মে নিযুক্ত ছিলেন। ডঃ রমন এখানে গবেষণা করেই তাঁর বিখ্যাত রমন ক্রিয়া’ আবিষ্কার করেন এবং ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে পদার্থবিদ্যায় নােবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।
বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা পরবর্তীকালে এখানে একটি সক্রিয় গবেষণা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে এক্স রশ্মি, আলােক-বিজ্ঞান, চৌম্বকত্ব, রমন ক্রিয়া প্রভৃতি বিষয়ে নানা মৌলিক গবেষণার কাজ হয়।
ঔপনিবেশিক বাংলা তথা ভারতে বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে আই. এ. সি. এস এবং তার প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকারের নাম নিঃসন্দেহে উল্লেখযােগ্য। আজও এই প্রতিষ্ঠান সগৌরবে তার অস্তিত্ব বজায় রেখে চলেছে।
4. টীকা লেখাে : জাতীয় শিক্ষা পরিষদ।
উত্তর: বঙ্গভঙ্গ বিরােধী আন্দোলন শুরুর থেকেই একদিকে যেমন ছিল সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করার প্রবণতা, অন্যদিকে ছিল জাতীয় উদ্যোগে স্বদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তােলার প্রয়াস। এরই সূত্র ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ।
প্রতিষ্ঠা : ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে রাসবিহারী ঘােষের সভাপতিত্বে এবং ব্রজেন্দ্রকিশাের রায়চৌধুরি, রাজা সুবােধচন্দ্র মল্লিক, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ শিক্ষাব্রতীর অর্থানুকূল্যে ও সক্রিয় পৃষ্ঠপােষকতায় কলকাতায় এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
উদ্দেশ্য : জাতীয় শিক্ষা পরিষদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিদেশি নিয়ন্ত্রণ-মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন এবং বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার।
কর্মকাণ্ড : কোনাে প্রকার সরকারি সাহায্য ছাড়াই জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অধীনে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বেঙ্গল ন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। বিপ্লবী অরবিন্দ ঘােষ (ঋষি অরবিন্দ) এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। এছাড়াও বাংলার নানা স্থানে গড়ে ওঠে আরাে অসংখ্য জাতীয় বিদ্যালয়। সাধারণ বিজ্ঞান ও কলা বিদ্যার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে আরােও জনপ্রিয় করে তোেলার লক্ষ্যে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অধীনে স্থাপিত হয় বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ নামে অপর একটি প্রতিষ্ঠান। বিশিষ্ট আইনজীবি তারকনাথ পালিত এর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অগ্রগণ্য,আর এর প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন প্রমথনাথ বসু। মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রসার এবং বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষাকে সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় জাতীয় শিক্ষা পরিষদের প্রতিষ্ঠাকে স্বদেশি আন্দোলনের প্রথম বৃহৎ গঠনমূলক প্রচেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছেন।
ব্যর্থতা: বিপুল উদ্দীপনা জাগিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত চরম অর্থাভাব এবং সরকারি চাকুরিতে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রির মূল্যহীনতা একে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে।
মন্তব্য : ব্যর্থতা সত্ত্বেও পরিশেষে বলা যায়, স্বদেশি যুগের এই বিজ্ঞান চর্চার প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নিঃসন্দেহে জাগরিত হয়েছে স্বদেশবােধ ও জাতীয়তা। ঔপনিবেশিক শিক্ষার পুতুল গড়ার কল ভেঙে সজীব মানুষ গড়ার শপথ নিয়েছিল এই প্রতিষ্ঠান ও এর সঙ্গে যুক্ত শিক্ষাব্রতীরা।
পঞ্চম অধ্যায়
বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ :বৈশিষ্ট্য ও পর্যালােচনা
বিশদ ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর : প্রশ্নমান ৮
1. ঔপনিবেশিক বাংলায় বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার বিকাশের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
উত্তর : বিজ্ঞান ও কারিগরি কর্মে ভারতবর্ষের ঐতিহ্য অতি প্রাচীন। সুপ্রাচীন হরপ্পা সভ্যতার যুগেও ভারতীয়দের উচ্চ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতার পরিচয় মেলে। ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চার এই বহমান ধারা ঊনবিংশ শতকে পাশ্চাত্য জ্ঞানলােকের স্পর্শে নব উদ্দীপনা লাভ করে। কায়েমী স্বার্থরক্ষাকারী ও প্রভুত্ববাদী ঔপনিবেশিক শিক্ষানীতির পাল্টা ভাবনা রূপে জন্ম নেয় জাতীয় বিজ্ঞানচর্চা।
ঔপনিবেশিক বাংলায় বিজ্ঞাল শিক্ষার গুসার
এই অংশে বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নে উল্লেখিত ইন্ডিয়ান অ্যাসােসিয়েশন ফর দ্যা কাল্টিভেশন অব সায়েন্স’, কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ এবং বসু বিজ্ঞান মন্দিরের ভূমিকা সংক্ষেপে আলােচনা করাে।
ঔপলিবশিক বাংলায় কারিগরি শিক্ষার প্রসার
ঔপনিবেশিক বাংলায় কারিগরি বিদ্যার ইতিহাস ঘাটলে যে নামটি সর্বাগ্রে উঠে তিনি হলেন শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের জনৈক কর্মী গােলকচন্দ্র, যিনি বিলিতি বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আদলে সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে বাষ্পীয় ইঞ্জিন নির্মাণের কৃতিত্ব দেখান। ১৮৫১-৫২ খ্রিস্টাব্দে ঔপনিবেশিক সরকার ভারতে টেলিগ্রাফ প্রচলনের উদ্যোগ নিলে বাঙালি ইঞ্জিনিয়ার শিবচন্দ্র নন্দী দুর্বার গতিতে পদ্মার বুকে সাবমেরিন কেবল পাতার কাজ নিতান্ত স্বল্প ব্যয়ে সমাপ্ত করেন। মহেন্দ্রনাথ নন্দী কাপড় বােনার যন্ত্র প্রস্তুত করেন। রাজকৃয় কর্মকার জলচক্র, বন্দুক এমনকি মেশিনগান তৈরিতেও পারদর্শিতা দেখান। প্রসন্ন কুমার ঘােষ, কালিদাস শীল, বিপিনবিহারী দাস প্রমুখ ব্যক্তিরাও কারিগরি বিদ্যায় যথেষ্ট কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। কারিগরি শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরােপ করে যােগেশচন্দ্র ঘােষ এটি অর্থভান্ডার গড়ে তােলেন, লক্ষ্য বিদেশে গিয়ে কারিগরি বিষয়ে জ্ঞানার্জনকারী ছাত্রদের আর্থিক সাহায্য করা।
কারিগরি শিক্ষা ও শিল্প প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রয়ােজন অনুভূত হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে সরকার ১৮৫৬ প্রতিষ্ঠা করে কলকাতা ইঙুিনিয়ারিং কলেজ’, যা পরবর্তীকালে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’ নামে পরিচিত হয় এবং যাদবপুরে স্থানান্তরিত হয়। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ বিরােধি আন্দোলন শুরু হলে একদিকে বেনন ছিল সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করার প্রবণতা, অন্যদিকে ছিল জাতীয় উদ্যোগে স্বদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তােলার প্রয়াস। এরই সূত্র ধরে কারিগরি শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ এবং বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট।
জাতীয় শিক্ষা পরিষদ: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন নং 9 থেকে সংক্ষেপে আলােচনা করাে।
বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট : বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন নং ১ থেকে সংক্ষেপে আলােচনা করাে।
মূল্যায়ন : স্বদেশি যুগের এই সকল বিজ্ঞান চর্চার প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নিঃসন্দেহে জাগরিত হয়েছে স্বদেশবােধ ও জাতীয়তা। ঔপনিবেশিক শিক্ষার পুতুল গড়ার কল ভেঙে সজীব মানুষ গড়ার শপথ নিয়েছিল এই সকল প্রতিষ্ঠান ও এর সঙ্গে যুক্ত শিক্ষাব্রতীরা।
[বি. দ্র : যেকোনাে একটি অংশের আলােচনা চাওয়া হলে প্রদত্ত উত্তরের ভূমিকা ও মূল্যায়ন অংশটি অপরিবর্তিত রেখে অন্য অংশটি পরিহার করাে।]
ষষ্ঠ অধ্যায়
বিশ শতকের ভারতে কৃষক, শ্রমিকও বামপন্থী আন্দোলন : বৈশিষ্ট্য ও পর্যালােচনা
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর: প্রশ্নমান 8
1. সারাভারত কিষান সভা কী উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?
উত্তর: কৃষিপ্রধান দেশ ভারতের জনসংখ্যার বৃহত্তম অংশ কৃষক সমাজকে গণআন্দোলনে সামিল করার সচেতন প্রচেষ্টা শুরু হয় মােটামুটি ১৯২০-৩০ এর দশকে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ কংগ্রেসের কিছু যুবনেতা কৃষক আন্দোলনগুলিকে সংগঠিত করতে প্রয়াসী হয়। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে আবির্ভূত হয়, সারাভারত ক্যিান সভা।
প্রতিষ্ঠা: ১৯৩০-এর দশকের গােড়া থেকেই বাংলা, বিহার, অন্ধ্রপ্রদেশ প্রভৃতি অঞ্চলে প্রাদেশিক কিষান সভা গড়ে উঠতে থাকলেও ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে লক্ষ্ণৌতে ‘নিখিল ভারত কিষান সভা’র প্রথম অধিবেশন বসে। সভাপতি মনােনীত হন স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী, আর সম্পাদক নিযুক্ত হন এন. জি. রঙ্গ।
উদ্দেশ্য : ১৯৩৬ সালের আগস্ট মাসে সারাভারত কিষান সভার তরফ থেকে যে ইস্তাহার প্রকাশিত হয়, তা থেকে এই সংগঠনের উদ্দেশ্যগুলি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে
(i) জমিদারি ও মহাজনি প্রথার বিলােপ, ভূমি রাজস্ব ও খাজনার পরিমাণ হ্রাস, বেগার প্রথার অবসান, অরণ্যচারীদের বনজ সম্পদ আরােহণের চিরাচরিত অধিকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সেচ ব্যবস্থার প্রসার প্রভৃতি দাবি আদায়।
এবং.(ii) জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে কৃষক শ্রেণির প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করা।
মন্তব্য : ভারতে কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে কিষান সভার প্রতিষ্ঠা এক স্মরণীয় ঘটনা। এর মাধ্যমে চিরাচরিত ভারতীয় কৃষি ব্যবস্থায় কোনাে মৌলিক পরিবর্তন সূচিত না হলেও এর দ্বারা কৃষক শ্রেণির রাজনৈতিক সচেতনতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং তারা একটি সংঘবদ্ধ শ্রেণিরূপে আবির্ভূত হয়।
2. অহিংস অসহযােগ আন্দোলনে কৃষক সমাজ কীভাবে অংশগ্রহণ করেছিল?
উত্তর: কৃষক সমাজের সার্বিক তথা স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অহিংস অসহযােগ আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
অহিংস অসহযােগ আন্দোলনে কৃষক সমাজের সর্বভারতীয় অংশগ্রহণ
বাংলা: গান্ধিজির অসহযােগের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে বাংলার কৃষক সমাজ আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ে। (ক) ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের নেতৃত্বে মেদিনীপুরের কাথি ও তমলুক মহকুমায় ইউনিয়ান বাের্ড বিরােধী আন্দোলন শুরু হয়। (খ) ১৯২১-২২ খ্রিস্টাব্দে পাবনা, বগুড়া ও বীরভূমে সরকারি জমি জরিপের কাজে বাধা দেওয়া হয়। বীরভূমে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন জিতেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। (গ) রাজশাহীতে নীলচাষের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন সােমেশ্বর প্রসাদ চৌধুরী। (ঘ) কুমিল্লা, রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুরে মুসলিম কৃষকদের অংশগ্রহণে অহিংস অসহযােগ আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে
উত্তরপ্রদেশ: (ক) গান্ধিজির নেতৃত্বে অহিংস-অসহযােগ আন্দোলন চলাকালে যুক্তপ্রদেশের হরদৈ, বারাবাকি, সীতাপুর, বারাইচ প্রভৃতি অঞলে যে কৃষক অভ্যুত্থান ঘটে, ইতিহাসে তা ‘একা’বা একতা আন্দোলন নামে পরিচিতি পেয়েছে। আন্দোলন চলাকালে যেকোনাে অবস্থায় কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ থাকার শপথ নেয়। তাই এই আন্দোলনের এইরূপ নামকরণ। মাদারি পাসি নামে অনুন্নত সম্প্রদায়ের এক নেতাই ছিলেন আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তি। (খ) বাবা রামচন্দ্র নামে জনৈক সন্ন্যাসীর নেতৃত্বে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ যুক্তপ্রদেশের প্রতাপগড় ও রায়বেরিলি অঞ্চলে কৃষক অভ্যুত্থান ঘটে। ওই বছরই বাবা রামচন্দ্র প্রতাপগড়ে অযােধ্যা কিষাণ সভা প্রতিষ্ঠা করেন। আন্দোলনের চাপে ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে সরকার ‘অযযাধ্যা খাজনা আইন পাশ করে করভার কিছুটা লাঘব করতে বাধ্য হয়।
বিহার : ১৯১৯ -২০ খ্রিস্টাব্দে বিহারের দ্বারভাঙা, মজফফরপুর, ভাগলপুর, পূর্ণিয়া ও মুঙ্গেরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে দ্বারভাঙার মহারাজার বিরুদ্ধে কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয়।
রাজস্থান : (ক) নানাধরনের উপকর ও সামন্ততান্ত্রিক শােষণের বিরুদ্ধে অসহযােগ পর্বে মেবারের বিজোলিয়া অঞ্চলে বিজয় সিং পথিক ও মানিকলাল বর্মার নেতৃত্বে কৃষক আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীরা ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে তাদের কিছুটা দাবি আদায়ে সক্ষম হয়। (খ) ১৯২১-২২ খ্রিস্টাব্দে মতিলাল তেজওয়াত মেবারের ভীল উপজাতিদের সংগঠিত করে আন্দোলনে সামিল হন।
দক্ষিণ ভারত: (ক) অন্ত্রের গুন্টুর জেলার পালনাদ তালুক ও কুড়াপার রায়চটি তালুকের উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত গরিব চাষিরা তাদের অরণ্যের অধিকার রক্ষার জন্য অরণ্য সত্যাগ্রহ গড়ে তােলে। (খ) অসহযােগ আন্দোলন চলাকালে দক্ষিণ ভারতে সর্বাপেক্ষা ব্যাপক ও ভয়াবহ কৃষক আন্দোলনটি সংঘটিত হয়েছিল ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে মালাবার উপকূলে, যা মােপলা বিদ্রোহ নামে পরিচিত। অনেকক্ষেত্রে এই বিদ্রোহ হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় পর্যবসিত হলেও এর মূল চরিত্র ছিল সামন্ততন্ত্র-বিরােধী।
মন্তব্য: অসহযােগ আন্দোলনের সময় থেকে প্রকৃতপক্ষে কৃষক আন্দোলন ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছিল।
3. টীকা লেখাে : মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা।
উত্তর: ভারতে কমিউনিস্ট দমনার্থে ব্রিটিশ সরকার যেসব প্রয়াস নিয়েছিল, ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা ছিল সেগুলির মধ্যে অন্যতম।
মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা :
পটভূমি: ভারতে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে শ্রমিক আন্দোলনের বিপুল অগ্রগতি ব্রিটিশ সরকারকে শঙ্কিত করে তােলে। শ্রমিকদের থেকে কমিউনিস্টদের আলাদা করা এবং তাদের দমন করার জন্য সরকার জননিরাপত্তা বিল’ ও ‘শিল্প বিরােধ বিল’ নামে দুটি দমনমূলক আইন পাশ করে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৩৩ জন কমিউনিস্ট নেতাকে গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৯) রুজু করা হয়।
অভিযুক্ত : মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য ছিলেন মুজাফফর আহমেদ, এস. এ. ডাঙ্গে, পি. সি. যযাশী, মিরাজকার, নলিনী গুপ্ত প্রমুখ ভারতীয় কমিউনিস্ট নেতা। অন্যদিকে, ফিলিপ স্ক্র্যাট ও বেঞ্জামিন ব্রাডলি নামে দুজন ব্রিটিশ কমিউনিস্ট নেতাকেও এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়।
মামলার রায় : দীর্ঘ সাড়ে চার বছর ধরে (১৯২৯-৩৩) বিচার প্রক্রিয়া চলার পর শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ অভিযুক্ত দীর্ঘমেয়াদিকারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘােষিত হয়।
প্রতিক্রিয়া : এই মামলা হ্যারল্ড ল্যাস্কি, আইনস্টাইন, এইচ. জি. ওয়েলস প্রমুখ মনীষীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দেশ-বিদেশে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সমালােচনার ঝড় ওঠে। পণ্ডিত নেহরু একে ‘জুডিসিয়াল স্ক্যানডেল’ বলে সমালােচনা করেন।
মন্তব্য: মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা ভারতীয় কমিউনিস্টদের সাময়িক দমিত করলেও তাদের অঙ্কুরে বিনাশ করতে পারেনি। কমিউনিস্টরা অচিরেই কংগ্রেস সমাজতন্ত্রীদলের মধ্যে থেকে শ্রমিক-কৃষকদের নিয়ে গণসংগ্রাম গড়ে তুলতে পূর্ণ উদ্যমে ঝাপিয়ে পড়েন।
ষষ্ঠ অধ্যায়
বিশ শতকের ভারতে কৃষক, শ্রমিকও বামপন্থী আন্দোলন : বৈশিষ্ট্য ও পর্যালােচনা
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর: (প্রশ্নমান ৮)
1. ভারত ছাড়াে আন্দোলনে শ্রমিকদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করাে। ওয়ার্কার্স অ্যান্ড গেজেন্টস্ পার্টি সম্পর্কে একটি টীকা লেখো। ৫ +৩ ]
উত্তর: প্ৰথম অংশ
শ্রমিক শ্রেণির সার্বিক তথা স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ভারতছাড়াে আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
ভারতচ্ছাড়াে আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণির অংশগ্রহণ :
বােম্বাই: আন্দোলনের সূচনার দিন থেকে পরবর্তী এক সপ্তাহ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৪২-এর ৯ থেকে ১৪ আগস্ট বােম্বাইতে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে গণবিক্ষোভ ঘটে। শিল্পাঞ্চল ও বন্দর এলাকায় ধর্মঘট পালিত হয়। সরকারি প্রশাসন সাময়িক লােপ পায়। পরিস্থিতির মােকাবিলায় সরকার পুলিশ ও সেনা তলব করে।
গুজরাট : মজদুর মহাজন সঙ্ঘের পরিচালনায় আমেদাবাদে বস্ত্রশিল্পের প্রায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার শ্রমিক ধর্মঘটে সামিল হয়। তারা আজাদ সরকার’ নামে একটি সমান্তরাল প্রশাসন গড়ে তােলে।
বিহার : এখানে টাটা লৌহ ইস্পাত কারখানার শ্রমিকরা ১০-১৩ আগস্ট টানা চারদিন ধর্মঘট করে। তারা দাবি জানায় যে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা কর্মবিরতি পালন করবে। ১২ আগস্ট ডালমিয়া নগরে শ্রমিক ধর্মঘট সংঘটিত হয়।
মহীশূর : বেঙ্গালুরু শিল্পাঞ্চল ও বিভিন্ন খনি অঞ্চলে শ্রমিক ধর্মঘট সংঘটিত হয়। পরিস্থিতি মােকাবিলায় পুলিশ গুলি চালায়।
অন্যান্য রাজ্য : এগুলি ছাড়াও দিল্লি, লক্ষ্ণৌ, কানপুর, নাগপুর, মাদ্রাজ, কলকাতা প্রভৃতি স্থানেও স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক ধর্মঘট সংঘটিত হয়।
ভারতে শ্রমিক আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকেই কমিউনিস্টরা এই আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত থাকলেও ভারতছাড়াে আন্দোলন পর্বে শ্রমিকশ্রেণি বামপন্থীদের সাহায্য বা সহযােগিতা কোনােটাই পায়নি। তৎসত্ত্বেও ভারতছাড়াে আন্দোলন পর্বে শ্রমিক শ্রেণির গৌরববাজ্জ্বল ভূমিকা নিঃসন্দেহে স্মরণীয়।
দ্বিতীয় অংশ
গান্ধিজি কর্তৃক অসহযােগ আন্দোলন অকস্মাৎ প্রত্যাহারের পর সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ কংগ্রেসের কিছু যুব নেতা শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনকে সংগঠিত করতে প্রয়াসী হন। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে আবির্ভূত হয় ওয়ার্কাস অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি।
ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টি
পটভূমি : ভারতীয় কমিউনিস্টদের পক্ষে খােলাখুলিভাবে কাজ করা অনেক ক্ষেত্রেই ছিল অসুবিধাজনক। তাই শ্রমিক-কৃষকের স্বার্থে জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরেই এই দল গড়ে ওঠে। জাতীয় কংগ্রেসের এই আন্দোলনের প্রতি পরােক্ষ সহানুভূতি ছিল।
প্রতিষ্ঠা: ১৯২৫ সালে কলকাতায় ‘লেবার স্বরাজ পার্টি অফ দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ নামে এই রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠে।
নাম পরিবর্তন: ১৯২৮ সালে কলকাতায় এই দলের সর্বভারতীয় সম্মেলনে এর নতুন নামকরণ হয়, ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি। দলের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন আর, এস. নিম্বকার।
নেতৃবৃন্দ: এই দলের নেতৃত্বের অধিকাংশই ছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের কাজকর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ। এদের মধ্যে কুতুবুদ্দিন আহম্মেদ, কাজী নজরুল ইসলাম, গােপেন চক্রবর্তী, নলিনী গুপ্ত প্রমুখ ছিলেন বিশেষ উল্লেখযােগ্য।
উদ্দেশ্য- ‘ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্পার্টি’ গড়েউঠেছিলশ্রমিকদের কাজের সময়সীমাহ্রাস, সর্বনিম্ন মজুরির হার নির্ধারণ, জমিদারি প্রথার অবসান ঘটানাে, শ্রমিক শ্রেণির আর্থ-সামাজিক উন্নতি সাধন, তাদের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার জাগরণ ঘটানাে প্রভৃতির উদ্দেশ্যে। কাজী নজরুল ইসলাম, মুজাফফর আহমেদ প্রমুখের উদ্যোগে লাঙল’ও ‘গণবাণী’ পত্রিকাকে মুখপত্র করে প্রাথমিকভাবে কংগ্রেসের মধ্যে থেকে ও পরবর্তীতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে শ্রমিক-কৃষক শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করতে চেয়েছিল এই প্রতিষ্ঠান।
প্রসার :প্রাথমিকভাবে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হলেও অচিরেই এই দলের সর্বভারতীয় প্রকাশ ঘটে। বােম্বাই, উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব প্রভৃতি স্থানে এর শাখা স্থাপিত হয় এবং শ্রমিক কৃষকদের স্বার্থে জোরদার আন্দোলন শুরু হয়।
মূল্যায়ন : জাতীয় আন্দোলনে জাতীয় কংগ্রেসের মূল ধারার পাশাপাশি ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টি’ দীর্ঘদিন একই সঙ্গে পথ হেঁটেছে বহুদূর। এদের প্রচেষ্টাতেই প্রাথমিকপর্বে সংঘবদ্ধ কৃষক-শ্রমিক আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল ভারতের বুকে।
সপ্তম অধ্যায়: বিংশ শতকের ভারতে নারী, ছাত্রী, প্রান্তিক জনগােষ্ঠীর আন্দোলন – বৈশিষ্ট্য ও পর্যালােচনা গঠন হল –
১. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর : প্রশ্নমান-১
১। প্রথম যিনি বয়কটের ডাক দিয়েছিলেন।
ক) সতীশচন্দ্র মুখােপাধ্যায়
খ) কৃষ্ণ কুমার মিত্র
গ) শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু
ঘ) রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী
২। ভারত “স্ত্রী মহামণ্ডল” স্থাপিত হয়েছিল –
ক) ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে খ) ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে ঘ) ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে
৩। নারী সত্যাগ্রহ সমিতি গড়ে তুলেছিলেন –
ক) বাসন্তী দেবী খ) লীলা নাগ
গ) কল্পনা দত্ত ঘ) প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
৪। গান্ধিজি যখন ডান্ডি অভিযান করেছিলেন তখন মােট স্বেচ্ছাসেবীর সংখ্যা ছিল –
ক) ৭৫ জন
খ) ৭৮ জন
গ) ৮০ জন
ঘ) ৮২ জন
৫। ভারতের প্রথম ছাত্রী।
ক) মুক্তি সংঘ খ) আনন্দ সংঘ
গ) দিপালী ছাত্রীসংঘ ঘ) সেবা সংঘ
৬। ১৯৩০-৩১ খ্রিস্টাব্দে ডিনামাইট ষড়যন্ত্রে যিনি সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন,
ক) লক্ষ্মী স্বামীনাথন
খ) কল্পনা দত্ত।
গ) লীলা নাগ
ঘ) প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
৭। যিনি বাংলার ‘অগ্নিকন্যা’ নামে খ্যাত ছিলেন
ক) মাতঙ্গিনী হাজরা খ) কল্পনা দত্ত।
গ) বীণা দাস ঘ) প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
৮। যাকে বিপ্লববাদের জননী বলা হয় –
ক) মাতঙ্গিনী হাজরা, খ) ভগিনী নিবেদিতা
গ) মাদাম কামা ঘ) সরােজিনী নাইডু
৯। কোন প্রতিষ্ঠানকে ‘গােলদিঘির গােলামখানা’ বলা হত –
ক) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে
খ) যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে
গ) ফোর্টউইলিয়াম কলেজকে
ঘ) এশিয়াটিক সােসাইটিকে
১০। লাবণ্যলতা চন্দ যে আন্দোলনের নেত্রী ছিলেন।
ক) বঙ্গভঙ্গবিরােধী আন্দোলন
খ) অসহযােগ আন্দোলন
গ) আইনঅমান্য আন্দোলন
ঘ) ভারতছাড়াে আন্দোলন
১১। ঢাকার মুক্তি সংঘ’-এর সংগঠক ছিলেন-
ক) দীনেশ গুপ্ত খ) হেমচন্দ্র ঘোষ
গ) মৃগেন দত্ত ঘ) মাস্টারদা সূর্যসেন
১২। স্ট্যানলি জ্যাকসনকে সমাবর্তন উৎসবে যিনি গুলি করেছিলেন –
ক) কল্পনা দত্ত খ) বীণা দাস
গ) প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ঘ) লীলা নাগ
১৩। রাইটার্স বিল্ডিং অভিযানে বিনয়-বাদল-দীনেশ যাকে হত্যা করেছিলেন –
ক) হাডসনকে খ) কিংসফোর্ডকে
গ) সিম্পসনকে ঘ) লােম্যানকে
১৪। রশিদ আলি দিবস পালিত হয় –
ক) বােম্বাইতে
খ) কলকাতায়
গ) ঢাকায়
ঘ) দিল্লিতে
১৫। প্রাচীন ভারতে অস্পৃশ্যদের বলা হত –
ক) তৃতীয় বর্ণ খ) চতুর্থ গােষ্ঠী
গ) পঞ্চম বর্ণ ঘ) পঞ্চম জাতি
১৬। ‘গুলামগিরি’ গ্রন্থের রচয়িতা হলেন
ক) বি আর আম্বেদকর খ) পি সি যােশী
গ) মহাত্মা গান্ধি ঘ) জ্যোতিবা ফুলে
১৭। “ভাইকম সত্যাগ্রহ সংঘটিত হয়েছিল –
ক) কেরলে খ) মালাবার উপকূলে
গ) তামিলনাড়ুতে ঘ) অন্ধ্রপ্রদেশে
১৮। আম্বেদকর যে সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন –
ক) নমঃশুদ্র খ) ইজাভা
গ) মাহার ঘ) চামার।
১৯। নমঃশূদ্রদের প্রতিষ্ঠিত সংগঠন হল –
ক) মতুয়া মহাসংঘ
খ) দলিত সংঘ
গ) দলিত সংগঠন
ঘ) নমঃশূদ্র সমিতি
২০। বেঙ্গল নমঃশূদ্র অ্যাসােসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠিত হয় –
ক) ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে খ) ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে
গ) ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে ঘ) ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে
| উ: ১(খ), ২(খ), ৩(ক), ৪(খ), ৫(গ), ৬(খ), ৭(খ), ৮(গ), ৯(ক), ১০(গ), ১১(খ), ১২(খ), ১৩(গ), ১৪(খ), ১৫(ঘ), ১৬(ঘ), ১৭(ক), ১৮(গ), ১৯(ক), ২০(ঘ)। |
শূন্যস্থান পূরণ করাে:
১। দ্য হিন্দু পত্রিকার মাধ্যমে গান্ধিজি অসহযােগ আন্দোলনে নারীদের যােগদানের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
২। রাষ্ট্রীয় স্ত্রী সংঘ এর সভাপতি ছিলেন সরোজিনী নাইডু।
৩। ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল গঠিত হয় ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে।
৪। ছেড়ে দাও’রেশমি চুড়ি’ গানটির রচয়িতা হলেন কবি মুকুন্দ দাস।
৫। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে সরলা দেবী চৌধুরানী লক্ষ্মীর ভাণ্ডার স্থাপন করেন।
৬। নারীদের ভােটাধিকার অর্জনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সরােজিনী নাইডু।
৭। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর ‘বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা ‘যিনি পাঠ করেছিলেন গিরিজা সুন্দরী।
৮। বাসন্তী দেবী বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে, খ্রিস্টাব্দে।
৯। সবরমতী আশ্রম থেকে গান্ধিজির ডান্ডি অভিযান শুরু হয়।
১০। ভারতছাড়াে আন্দোলনের সময় মেদিনীপুর জেলায় গঠিত হয় ভগিনী সেনা।
১১। ভারতছাড়াে আন্দোলনের একজন মুসলিম নেত্রী ছিলেন রাজিয়া খাতুন।
১২। স্বদেশ বান্ধব সমিতি গড়ে তুলেছিলেন অশ্বিনীকুমার দত্ত।
১৩। সতীশচন্দ্র সামন্ত -এর নেতৃত্বে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার গড়ে ওঠে।
১৪। স্বরাজ্য তহবিল গড়ে ওঠে অসহযোগ, আন্দোলনের সময়।
১৫। নারী সত্যাগ্রহ সমিতি তৈরি হয়েছিল অসহযােগ আন্দোলনের সময় ।
১৬। নারী সত্যাগ্রহ সমিতি তৈরি হয়েছিল কলকাতা শহরে।
১৭। সত্য বালা দেবী বীরভূমে আইন অমান্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
১৮। আইন-অমান্য আন্দোলনের একজন দলিত নেত্রী হলেন আইন অমান্য।
১৯। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সময় গান কটন’ তৈরিতে সচেষ্ট হয়েছিলেন বিপ্লবী কল্পনা দত্ত।
২০। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কল্পনা দত্তকে অগ্নিকন্যা, নামে অভিহিত করেন।
২১। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সময় কল্পনা দত্তের সঙ্গী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, ছিলেন।
২২। প্রতিক্রিয়াশীল বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাশ হয়েছিল ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে।
২৩। প্রতিক্রিয়াশীল বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস করেছিলেন লর্ড কার্জন।
২৪। জালালাবাদ পাহাড়ে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর বিপ্লবীরা আশ্রয় নিয়েছিলেন।
২৫। আলি ভ্রাতৃদ্বয় নামে পরিচিত ছিলেন মােহাম্মদ আলি ও শওকত আলি,
২৬। সত্যশােধক সমাজ গড়ে ওঠে জ্যোতিবা ফুলের উদ্যোগে।
২৭। সত্যশােধক সমাজ গড়ে ওঠে ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে।
২৮। ভারতের নির্বাচনে তপশিলি জাতির আসন সংরক্ষণ হয় পুনা চুক্তি চুক্তির দ্বারা।
২৯। মতুয়া মহাসংঘের সংগঠক ছিলেন হরিচাঁদ ঠাকুর।
৩০। গুরুচাঁদ ঠাকুরের মৃত্যুর পর নমঃশূদ্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রমথরঞ্জন ঠাকুর।
৩১। মতুয়া মহাসংঘের বর্তমান প্রধান কার্যালয় উত্তর ২৪ পরগণার ঠাকুরনগরে।
| উ: ১। দ্য হিন্দু, ২। সরোজিনী নাইডু, ৩। ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে, ৪। কবি মুকুন্দ দাস, ৫। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে, ৬। সরােজিনী নাইডু, ৭। গিরিজা সুন্দরী, ৮। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে, ৯। সবরমতী, ১০। ভগিনী সেনা, ১১। রাজিয়া খাতুন, ১২। অশ্বিনীকুমার দত্ত, ১৩। সতীশচন্দ্র সামন্ত, ১৪। অসহযোগ, ১৫। অসহযােগ, ১৬। কলকাতা, ১৭। আইন অমান্য, ১৮। সােনালী সােলাঙ্কি, ১৯। কল্পনা দত্ত, ২০। অগ্নিকন্যা, ২১। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, ২২। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে, ২৩। লর্ড কার্জন, ২৪। জালালাবাদ, ২৫। মােহাম্মদ আলি, শওকত আলি, ২৬। জ্যোতিবা ফুলের, ২৭। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে, ২৮। পুনা চুক্তি, ২৯। হরিচাঁদ ঠাকুর, ৩০। প্রমথরঞ্জন ঠাকুর, ৩১। ঠাকুরনগরে। |
দ্বিতীয় অধ্যায়
১. উনিশ শতকে বাংলায় ‘নবজাগরণ’ ধারণার ব্যবহার-বিষয়ক বিতর্ক সম্পর্কে আলোচনা করো।
অথবা
উনিশ শতকে ‘বাংলার নবজাগরণ’ বলতে কী বোঝো? এই নবজাগরণের চরিত্র বা প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করো।
২. নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল কাদের বলা হয়? উনিশ শতকে বাংলার ইতিহাসে নব্যবঙ্গদের অবদান উল্লেখ করো।
তৃতীয় অধ্যায়
১. নীল বিদ্রোহ কারণ ও নীল বিদ্রোহের গুরুত্ব আলোচনা করো?
২. সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ ও সাঁওতাল বিদ্রোহের গুরুত্ব আলোচনা করো।
চতুর্থ অধ্যায়
১. টীকা: মহারানির ঘোষণাপত্র (১৮৫৮ খ্রি.)।
অথবা, মহারানির ঘোষণাপত্রে (১৮৫৮ খ্রি.) কী বলা হয়?
২. ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র বা স্বরূপ সম্পর্কে আলোচনা করো।
পঞ্চম অধ্যায়
১. বিজ্ঞান চর্চায় বসু বিজ্ঞান মন্দির ও কলকাতার বিজ্ঞান কলেজের অবদান উল্লেখ করো।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন